রমজানের শেষ ১০ দিন: নাজাতের ১০টা সূরা—জাহান্নাম থেকে মুক্তি!
রমজানের প্রথম ২০ দিন চলে গেছে।
এখন এসেছে—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০ দিন।
অনেক জায়গায় নবী করিম ﷺ–এর নামে বলা হয়: “রমজানের প্রথম দশ দিন রহমত, মাঝের দশ দিন মাগফিরাত, শেষ দশ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি।” এই কথাটি খুব প্রচলিত। নোট হিসেবে বলি—এর সনদ/দৃঢ়তা নিয়ে উলামাদের আলোচনা আছে। তবে শেষ দশকে ইবাদত বাড়ানো, বেশি করে দোয়া–তওবা করা, শবে কদর খোঁজা—এগুলো সহীহ হাদিসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
আর এই ১০ দিনকে বলা হয়—নাজাতের দিন, মুক্তির দিন।
আয়েশা (রা.) বলেন—“রমজানের শেষ দশক আসলে নবী করিম ﷺ কোমর বেঁধে নিতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারকে জাগাতেন।” (সহীহ আল-বুখারি: ২০২৪, সহীহ মুসলিম: ১১৭৪)
আরো বলেন—“নবী করিম ﷺ শেষ দশকে এমন পরিশ্রম করতেন, যা অন্য সময়ে করতেন না।” (সহীহ মুসলিম: ১১৭৫)
কারণ এই ১০ দিনের ভেতরেই আছে—লাইলাতুল কদর, হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত। আর এই সময়েই বান্দা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি ফিরে আসে।
এখন প্রশ্ন—এই ১০ রাতে কীভাবে গুছিয়ে কুরআনের সাথে থাকবেন?
আপনি চাইলে ১০টা সূরা ধরতে পারেন—যেগুলো শবে কদর, কিয়ামত, আখিরাত, হিসাব, নাজাত—এসব মনে করিয়ে দেয়। রাতে পড়ুন, অর্থ ভাবুন, তারপর দোয়া করুন। দিনগুলো বদলে যাবে ইনশাআল্লাহ।
১) সূরা ক্বদর — শবে কদরের সূরা
এই সূরায় আল্লাহ নিজেই বলেছেন—
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
“নিশ্চয়ই আমরা এটা নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সূরা ক্বদর: ১–৩)
নবী করিম ﷺ বলেছেন—“যে ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে দাঁড়াবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ।” (সহীহ আল-বুখারি: ১৯০১, সহীহ মুসলিম: ৭৬০)
কখন পড়বেন
শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯)। বারবার পড়ুন। ছোট সূরা—কিন্তু গভীর।
শবে কদরের দোয়া
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি
অর্থ: হে আল্লাহ, তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসো, আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিজি: ৩৫১৩, ইবনে মাজাহ: ৩৮৫০)
২) সূরা দুখান — লাইলাতুম মুবারাকাহ
এই সূরায়ও “বরকতময় রাত”-এর কথা এসেছে—
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ
“আমরা এটা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে।” (সূরা দুখান: ৩)
আরো আছে—
فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
“এই রাতে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থির করা হয়।” (সূরা দুখান: ৪)
কখন পড়বেন
শবে কদরের রাতে তাহাজ্জুদে। তারপর নিজের তাকদীরের জন্য কান্না করে দোয়া করুন।
৩) সূরা মুলক — কবরের আজাব থেকে রক্ষা
নবী করিম ﷺ বলেছেন—“কুরআনে ৩০ আয়াতের একটি সূরা আছে, যা ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করবে যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়… তা হলো ‘তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলক’।” (আবু দাউদ: ১৪০০, তিরমিজি: ২৮৯১, ইবনে মাজাহ: ৩৭৮৬)
আরো এসেছে—এটি কবরের আজাব থেকে রক্ষা করে। (তিরমিজি: ২৮৯০)
কখন পড়বেন
প্রতি রাত ঘুমানোর আগে ১ বার—শেষ দশকে এটা যেন বাদ না যায়।
৪) সূরা সাজদাহ — তাহাজ্জুদের সূরা
এই সূরায় আল্লাহ তাহাজ্জুদকারীদের প্রশংসা করেন—
تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا
“তাদের পার্শ্ব বিছানা থেকে আলাদা থাকে… তারা তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশা নিয়ে।” (সূরা সাজদাহ: ১৬)
আর বলেন—
فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ
“কেউ জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী লুকিয়ে রাখা হয়েছে।” (সূরা সাজদাহ: ১৭)
কখন পড়বেন
তাহাজ্জুদে। বিশেষ করে শেষ দশকে—যতটা পারেন রাত বাড়ান।
৫) সূরা মুজাম্মিল — রাতের ইবাদতের ডাক
আল্লাহ বলেন—
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ
قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا
… وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
“হে চাদর মুড়ি দেওয়া! রাতে দাঁড়াও… এবং কুরআন তারতিলের সাথে পড়ো।” (সূরা মুজাম্মিল: ১–৪)
কখন পড়বেন
শেষ দশ রাত তাহাজ্জুদে। ধীরে ধীরে, তারতিল করে।
৬) সূরা নাবা — কিয়ামতের মহা সংবাদ
عَمَّ يَتَسَاءَلُونَ
عَنِ النَّبَإِ الْعَظِيمِ
“তারা কী নিয়ে প্রশ্ন করছে? মহা সংবাদ নিয়ে।” (সূরা নাবা: ১–২)
এখানে জান্নাত–জাহান্নামের দৃশ্য আছে—যা হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়।
কখন পড়বেন
মাগরিবের পর বা তাহাজ্জুদের আগে। জান্নাতের আশা, জাহান্নামের ভয়—দুটোই জাগে।
৭) সূরা ইনফিতার — আমলনামার সতর্কতা
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ
كِرَامًا كَاتِبِينَ
يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ
“তোমাদের উপর রক্ষক নিযুক্ত আছে… সম্মানিত লেখক… তারা জানে তোমরা কী করো।” (সূরা ইনফিতার: ১০–১২)
কখন পড়বেন
রাতে শোবার আগে। তারপর নিজেকে প্রশ্ন করুন—আজ আমার আমলনামায় কী গেল?
৮) সূরা জিলজাল — অণু পরিমাণও হিসাব
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ
وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
“যে অণু পরিমাণ ভালো করবে তা দেখবে, আর যে অণু পরিমাণ খারাপ করবে তাও দেখবে।” (সূরা জিলজাল: ৭–৮)
কখন পড়বেন
যখন মনে হয়—ছোট গুনাহ কিছু না। এই সূরা পড়লেই মনে পড়ে—সব হিসাব হবে।
৯) সূরা কারিয়াহ — পাল্লা ভারী করার ডাক
فَأَمَّا مَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَّاضِيَةٍ
وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ
“যার পাল্লা ভারী হবে সে সুখী জীবনে থাকবে, আর যার পাল্লা হালকা হবে তার আশ্রয় হাওয়িয়াহ।” (সূরা কারিয়াহ: ৬–৯)
আর পাল্লা ভারী করার সহজ জিকিরও নবী করিম ﷺ বলেছেন—
“সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম”—জিহবায় হালকা, পাল্লায় ভারী। (সহীহ আল-বুখারি: ৬৪০৬, সহীহ মুসলিম: ২৬৯৪)
কখন পড়বেন
শেষ দশকে যত পারেন নেক আমল বাড়ানোর আগে। তারপর জিকির বাড়ান।
১০) সূরা তাকাসুর — দুনিয়ার মোহ ভাঙার সূরা
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ
حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফিল করে রেখেছে—যতক্ষণ না তোমরা কবর পরিদর্শন করো।” (সূরা তাকাসুর: ১–২)
আর শেষে—
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ
“তারপর অবশ্যই তোমরা সেদিন নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সূরা তাকাসুর: ৮)
কখন পড়বেন
রাতে আত্মসমালোচনার সময়। তারপর শুকরিয়া ও তওবা।
মনে রাখবেন
শেষ ১০ দিন—শুধু “আরও আমল” না—এটা জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।
নবী করিম ﷺ নিজে রাত জাগতেন, পরিবারকে জাগাতেন—এটাই আমাদের শিক্ষা। আপনি যতটা পারেন—সেই মাত্রায় চেষ্টা করুন। অল্প হলেও ধারাবাহিকতা রাখুন।
আর আপনি চাইলে এই ১০ রাতের জন্য একটা খুব সহজ রুটিন ধরতে পারেন—
রাতে ১টা সূরা (আজ ১টা, কাল ১টা)
তারপর ৫ মিনিট চোখ বন্ধ করে অর্থ ভাবা
তারপর ১০ মিনিট কান্না–দোয়া–তওবা
এটাই যথেষ্ট শক্তিশালী। #দোয়া ও যিকির 🤲🏻🤲🏻🤲🏻 #🤲আল্লাহ 👆 #📖কোরানের বাণী🤲🏻 #ইসলামি স্ট্যাটাস #🤲 ইসলামিক দোয়া🤲