|| জয়মঙ্গলবার ব্রতকথা ||
নশ্বর দেহে যদি প্রতিদিন একবারের জন্যেও মায়ের নাম করা যায়, তাহলে এ জীবন আমার অনেকাংশে সার্থক বলেই মনে করি। মায়ের নাম যাতে স্মরণে থাকে তার ব্যবস্থা মা নিজেই করে থাকেন। এখন এটাকে অনেকে বলতে পারেন মা নিজেই আরাধনা চেয়ে নিচ্ছেন, কিন্তু আদতে আমরা শুধু করে চলেছি গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো!
তীব্র গরমের জ্যৈষ্ঠ মাস! মা-ঠাকুমারা বলে থাকেন আম-ক্যাঁঠাল পাকানো জষ্টি মাস। এমাসের মঙ্গলবার এখনো মাকে স্মরণ করে চলেছেন বাংলার মায়েরা। পালন করে চলেছেন জয়মঙ্গলবার ব্রত। কেউ কেউ সেটা পালন করছেন শুধু প্রথম আর শেষ মঙ্গলবার। কেউ হয়তো সব মঙ্গলবার গুলোই। সেই কোনোকালে ছড়িয়ে গিয়েছিল এ ব্রত পালনে স্বামী-সন্তান ভালো থাকে, বিপদ দূরে থাকে। আর বাংলার মায়েদের মত পরিবারকে আঁকড়ে ধরা আমি অন্যদের মধ্যে তেমন দেখিনি। আজ বলবো জ্যৈষ্ঠের জয়মঙ্গলবার ব্রতের কথা।
অন্যান্য সব ব্রতের কথার মতোই এইখানে দেখা যায় এক ধনী সওদাগর আর গরীব বেনের কথা। সওদাগরের সাত ছেলে, মেয়ে নেই, অপরদিকে বেনের পরিবারের সাত মেয়ে, ছেলে নেই।
মা মঙ্গল চণ্ডী এলেন সওদাগরের বাড়ি বৃদ্ধা ভিখারিনী সেজে। ভিক্ষা নেবার সময় বৃদ্ধা সওদাগর গিন্নিকে কয় ছেলে-মেয়ে আছে জানতে চাইলে সে বলে ঠাকুরের কৃপায় সাত ছেলে হলেও, কোনো মেয়ে নেই।
তখন রাগী বৃদ্ধা বলেন যে সে ছেলে-আটকুড়ার মায়ের মুখ দেখে না, মেয়ে আটকুড়ার মায়ের দান নেয় না! এই বলে সে চলে আসতে থাকলে গিন্নি তার পায়ে পড়ে যায়, তা দেখে বৃদ্ধার করুণা হলে সে একটি ফুল দেয় যা সেবন করতে বলে ঐ গিন্নিকে। গিন্নী বৃদ্ধার কথামত ঐ ফুল গ্রহণ করে। ফলে তার কন্যাসন্তান আসে কোলে, বৃদ্ধার নির্দেশ মতোই নাম রাখা হয় জয়াবতী।
ঐ বৃদ্ধা একই কাণ্ড করে বসে বেনে গিন্নির কাছে। একইভাবে তাকেও ফুল দেয় সে, যা সেবনের মাধ্যমে বেনে গিন্নির কোলে পুত্রসন্তান আসে। বৃদ্ধার কথামতো এর নাম রাখা হল জয়দেব।
সময় চলে যায়। তারা বড় হল, দুজনেই একই অঞ্চলে বসবাস করতো। একদিন জয়দেবের পায়রা উড়ে গিয়ে বসলো জয়াবতীর কাছে। মজা করার উদ্দেশ্যে প্রথমে জয়াবতী তা ফেরত দিতে চায় না। কিন্তু জয়দেব যখন তার পুজোর আয়োজন পণ্ড করে দিতে চায় তখন ভয় পেয়ে সেই পায়রা সে ফেরত দেয়। আসলে সেই পুজো ছিল মঙ্গলচণ্ডীর পুজো। জয়াবতী জানায় এই ব্রত করলে স্বামী-সন্তানের বিপদ হয় না, আগুনে পোড়ে না, খাঁড়ায় কাটেনা, জলে ডুবে মরে না! অর্থাৎ যেকোনো ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পায়।
জয়দেবের মন কিন্তু শুধু কথায় বিশ্বাস করেনি, যাচাই করতে চেয়েছে। পরবর্তীতে দুজনের বিবাহ হয়। যদিও তাদের মধ্যে কিছু পার্থক্য ছিল, কিন্তু দুই পরিবারের সম্মতিতে এই বিবাহ হয়। বিয়ের পরে এক নদী পারাপারের সময় জয়দেব তার স্ত্রীর সমস্ত গয়না জড়ো করে পুঁটলিতে বেঁধে নদীতে ফেলে দেয় ডাকাত আক্রমণ থেকে বাঁচতে। আর ঐ পুঁটলি চলে যায় বড়ো এক বোয়ালের পেটে!
এদিকে নতুন বৌ এর গায়ে গয়না না দেখে শ্বশুরবাড়ির লোকজন যা খুশি তাই বলতে থাকে। সবাই ভাবে গরীব ছেলেকে বিয়ে করার জন্যেই এইরকম ভাবে মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়েছে তারা।
এরপর বৌভাতের দিন মাছ রান্না হবে, সেই নদীতে জাল ফেলে উঠলো সেই বোয়াল! আসলে মা আগে থেকেই অন্যান্য মাছ সরিয়ে নিয়েছিলেন নদী থেকে।
এবার আরো আশ্চর্য, সেই মাছ কেউ দ্বিখণ্ড করতে পারলো না, অবশেষে কাজটি করলো নতুন বৌ জয়াবতী। মাছের পেট থেকে বেরিয়ে আসে সেই গয়নার পুঁটলি!
এখবর জানাজানি হয়ে গোটা গ্রাম চলে আসে। কিন্তু তাদের তো খাওয়াতেও হবে! রাঁধুনি অনুপস্থিত। জয়াবতী নিজেই অতজনের রান্না করে ফেললো নিমেষে! একদম নব্বই দশকের বাংলা সিনেমায় সবজি যেমন লাইন দিয়ে এসে নিজেই ভাজা হয়ে যেত সেরকম হতে পারে! যা কিছুই হল সব মায়ের কৃপায়।
কালক্রমে তাদের কোলে সন্তান এলো। জয়দেব এখনো পুরোপুরি মানতে নারাজ। সে শিশুপুত্রকে কুমোরের পোয়ানে রেখে আসে। কিন্তু কুমোররা কাজ করতে গিয়ে দেখে তাতে আগুন ধরে না, কারণ ভিতরে সেই শিশুটি আছে। সেখান থেকে উদ্ধার হয়।
এবার একদিন শিশুটিকে জয়দেব পুকুরে ডুবিয়ে আসে, শিশু আবার ফিরে আসে মায়ের কোলে! মঙ্গলচণ্ডী আবার রক্ষা করলেন ভক্তের শিশুকে।
এবার একদিন কাটারি নিয়ে শিশুর ওপর উদ্যত হতে যাবে জয়দেব, তখন জয়াবতী তার হাত ধরে জিজ্ঞাসা করে এখনো মঙ্গলচণ্ডীর ওপর সন্দেহ আছে? জয়দেব নিজের ভুল বুঝতে পারে। এরপর থেকে দুজনেই জ্যৈষ্ঠের মঙ্গলবার মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত করতে থাকে। সঠিক সময়ে দুজনের স্বর্গপ্রাপ্তি হয়।
এই ব্রতের তাৎপর্য কি? সবধরনের বিপদ থেকে রক্ষা প্রদান পরিবারের সকল সদস্যদের। আজকেও মায়েরা এই ব্রত পালন করে থাকেন, মায়ের পুজো দেন। আমার মতে প্রত্যেকের এই ব্রত পালন করা উচিত। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। মায়ের কৃপায় সত্য সত্যই বিপদ উদ্ধার হয় এ আমার নিজের উপলব্ধি।
ব্রত পালন বলতে নিজের সাধ্যমত মায়ের উপাসনা, আর ঐ দিনটি নিরামিষ ভক্ষণ। তবে প্রার্থনায় জোর থাকা জরুরি। ঘরে থেকেও করা যায়। প্রার্থনায় যেন চ্যুতি না ঘটে।
জয় মা! মায়ের ব্রতকথারা জাগ্রত থাক। মায়েরা পাক আরো শক্তি...
#🙂ভক্তি😊 #🙂সনাতন ধর্ম🙏 #জয় মা মঙ্গল চন্ডী #শুভ মঙ্গলবার #😃ভক্তিময় সন্ধ্যা😇