বাংলার বীরাঙ্গনা 'রায় বাঘিনী' ভবশঙ্করী রায়ের গল্প
বাংলার ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমন অনেক বীরকন্যার দেখা মেলে, যাঁদের শৌর্য এবং বীরত্বের কাহিনী সেভাবে মূলধারার আলোচনায় উঠে আসেনি। ষোড়শ শতাব্দীর এমনই এক বিস্মৃতপ্রায় এবং তেজস্বী বীরাঙ্গনা হলেন **মহারানী ভবশঙ্করী**, **যিনি ইতিহাসে **'রায় বাঘিনী'**** নামে অমর হয়ে আছেন।
বর্তমান হাওড়া এবং হুগলি জেলার বিস্তীর্ণ অংশ নিয়ে একসময় গড়ে উঠেছিল স্বাধীন হিন্দু রাজ্য ****ভুরশুট (Bhurshut)****। এই ভুরশুটেরই রানী ছিলেন ভবশঙ্করী। তাঁর রোমাঞ্চকর জীবনের গল্প হার মানায় যেকোনো রূপকথার কাহিনীকে।
### অস্ত্রশিক্ষায় পারদর্শী শৈশব**
ভবশঙ্করীর জন্ম হয়েছিল এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে।তাঁর পিতা দীননাথ চৌধুরী ছিলেন একজন দক্ষ সেনাপতি। ছোটবেলা থেকেই ভবশঙ্করী প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাছে তলোয়ার চালনা, তিরন্দাজি, বর্শা নিক্ষেপ এবং ঘোড়ায় চড়ায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। কথিত আছে, কৈশোরেই তিনি একা একটি বন্য মহিষ বা বাঘকে পরাস্ত করেছিলেন। তাঁর এই অসীম সাহসিকতার খবর পৌঁছে যায় ভুরশুটের রাজা রুদ্রনারায়ণের কানে। তিনি ভবশঙ্করীর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহ করেন।
## সিংহাসনের দায়ভার ও পাঠানদের চক্রান্ত**
রাজা রুদ্রনারায়ণের আকস্মিক মৃত্যুর পর (মতান্তরে তিনি যখন রাজ্যের বাইরে ছিলেন), ভুরশুট রাজ্যের আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে। ষোড়শ শতাব্দীর সেই সময়টা ছিল বাংলা দখলের জন্য মোগল এবং আফগান (পাঠান) শক্তির মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের যুগ। উড়িষ্যা এবং বাংলার পাঠান সেনাপতি **ওসমান খাঁ** ভুরশুট রাজ্যকে দুর্বল ভেবে এবং সিংহাসনে একজন নারীকে দেখে রাজ্য আক্রমণের ছক কষেন।
## 'রায় বাঘিনী'র রুদ্রমূর্তি ও কস্তাসংগড়ার যুদ্ধ**
পাঠানদের ধারণা ছিল, একজন বিধবা নারী সহজেই আত্মসমর্পণ করবেন। কিন্তু তারা ভবশঙ্করীর আসল রূপ চিনতে পারেনি।গুপ্তচরদের মাধ্যমে পাঠানদের আক্রমণের খবর পেয়ে রানী ভবশঙ্করী বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন।
তিনি রাজকীয় পোশাক ছেড়ে গায়ে চাপান বর্ম, হাতে তুলে নেন খোলা তলোয়ার এবং অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে নিজেই সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দামোদর নদের তীরে **কস্তাসংগড়া (বা বাঁশড়ী)** নামক স্থানে ভুরশুটের সেনাবাহিনীর সাথে পাঠান বাহিনীর এক ভয়ংকর যুদ্ধ হয়।
রানী ভবশঙ্করী রণক্ষেত্রে সাক্ষাৎ দেবী রণচণ্ডীর মতো অবতীর্ণ হন। তাঁর দুই হাতের তলোয়ারের আঘাতে পাঠান সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রানীর এই ভয়ংকর এবং অপ্রতিরোধ্য মূর্তি দেখে পাঠানরা রণে ভঙ্গ দিয়ে পালাতে বাধ্য হয়। যুদ্ধে ওসমান খাঁয়ের বিশাল বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে।
**### মোগল সম্রাট আকবরের স্বীকৃতি**
সেই সময় পাঠানরা ছিল মোগলদের চরম শত্রু। একজন বাঙালি হিন্দু নারীর হাতে দুর্ধর্ষ পাঠান বাহিনীর এই শোচনীয় পরাজয়ের খবর পৌঁছায় খোদ মোগল সম্রাট আকবরের দরবারে। সম্রাট আকবর রানী ভবশঙ্করীর এই অসীম বীরত্ব ও সামরিক দক্ষতায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি ভুরশুট রাজ্যের স্বাধীনতা মেনে নেন এবং রানীর সাথে মিত্রতা স্থাপন করেন।
সম্রাট আকবরই রানীর সাহসিকতার প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁকে **'**রায় বাঘিনী'** (The Tigress) **উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। মোগল দরবার থেকে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল রাজকীয় তরবারি, মহার্ঘ্য পোশাক এবং স্বীকৃতিপত্র।
****ঐতিহাসিক গুরুত্ব****
রানী ভবশঙ্করী কেবল একজন বীর যোদ্ধাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সুশাসক। তাঁর রাজত্বকালে ভুরশুট রাজ্য প্রভূত উন্নতি লাভ করে। তিনি অসংখ্য মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, যার মধ্যে 'ভবানীশ্বর' শিবমন্দির অন্যতম। বাংলার মাটিতে নারীশক্তির উত্থান এবং দেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে 'রায় বাঘিনী' ভবশঙ্করীর নাম আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
**কাশ্মীরের ইতিহাসের সেই রোমহর্ষক অধ্যায়টি কি
##অজানা_ইতিহাসের_খোঁজে#AjanaItihaserKhoje#InSearchofUnknownHistory#শিক্ষামূলক_অজানা_তথ্য পড়েছেন? জানুন শেষ হিন্দু সম্রাজ্ঞী কোটারানির অজানা কাহিনী — ****কাশ্মীরের 'ক্লিওপেট্রা' কোটারানি: কাশ্মীরের শেষ হিন্দু রানী ** https://www.ojanaitihaskhonje.com/2026/04/kota-rani-last-hindu-queen-kashmir.html