আপনার ভাষা বদলান
Tap the Share button in Safari's menu bar
Tap the Add to Home Screen icon to install app
ShareChat
এই লেখাটা পড়লে মনের অনেক ধোঁয়াশা কেটে যাবে।👇 "শান্ত সেই দুই নয়নের খোঁজে" রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মানবজাতির এক মহৎ মর্যাদা। কারণ তাঁদের জীবনালোকে প্রতিষ্ঠিত নব্যবেদান্ত মানুষকে অন্ধ কুসংস্কার,গোঁড়ামি ও যুক্তিহীন আড়ম্বরসর্বস্ব ধর্মের ঊর্দ্ধে অবস্থিত আধ্যাত্মিক সত্যের পথে পরিচালিত করে। এই নিবন্ধটি তারই উজ্জ্বল সোনালী ফসল। লেখক রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত একাধিক আবাসিক প্রতিষ্ঠানের কৃতি ছাত্র ও বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক “শ্রী তাজউদ্দিন আহমেদ"। মননের নরম অথচ প্রত্যয়ী আলোয় উদ্ভাসিত এই নিবন্ধটি পাঠকবর্গের অন্তরে একটি ভালবাসার জন্ম দিয়ে যাবে, যে ভালবাসার নাম --“রামকৃষ্ণ"। “আমাদের বাড়িতে ধর্মাচরণ নিয়ে কোনদিনই বিশেষ বাড়াবাড়ি ছিল না। আমার আব্বা নমাজ পড়া বা রোজা রাখার ব্যাপারে বেশ অনিয়মিতই ছিলেন। আমার মা অবশ্য বেশ নিয়মনিষ্ঠ ছিলেন এবং আমাকেও এসবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। সালটা ১৯৮৪। অ্যাডমিশন টেষ্ট দিয়ে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠ, পুরুলিয়াতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। বাড়িতে বেশ একটা খুশির হাওয়া। চোখের জল মুছে মা আমার জিনিসপত্র কেনাকাটা, গোছগাছ করছেন। এমতাবস্থায় বাড়ি এলেন আমাদের সম্পর্কিত নানাজান। তিনি এসেই একটা বেয়াড়া প্রশ্ন তুললেন,”হ্যাঁরে,তোরা ছেলেটাকে শেষ পর্যন্ত রামকৃষ্ণ মিশনে পড়াবি ? ছেলেটা তো পূজা-আচ্চা শিখে একেবারে কাফের হয়ে যাবে”। আমার আব্বা অত্যন্ত শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিলেন,”আমি রামকৃষ্ণ মিশন সম্পর্কে জানি যে, সেখানে কখনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় না। স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি, তিনি এসব শেখাননি”। অবশ্য নানাজান এবং আরো অনেক আত্মীয়স্বজনের বদ্ধমূল এই সন্দেহ ও সংশয় আমার মনে কোন দাগ কাটে নি। কারণ,ততদিনে ছবিতে ভরা কয়েকটি বই পড়ে শ্রীরামকৃষ্ণ,স্বামী বিবেকানন্দ এবং শ্রীমা সারদাদেবী সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা হয়েছিল। ওই ছোট্ট বয়সের সীমিত বুদ্ধিতে কেন জানিনা আমার মনে হয়েছিল, খালি গা আর শান্ত চোখের ধ্যানস্থ মানুষটিকে আমি ভালো না বেসে থাকতে পারব না। তারপর বিদ্যাপীঠ। শ্রীরামকৃষ্ণ আঙিনায় আমার প্রথম পা ফেলা। সেই প্রশস্ত খেলার মাঠ, বন্ধুদের সাথে খুনসুটি, পড়া না পারায় শিক্ষকের বকুনি আর সকাল সন্ধ্যে দুবেলায় প্রার্থনা। ঠাকুরঘর কেমন হয় সে ধারণা ছিল না। এখনো মনে আছে, সেই অগুরু ও ধূপের গন্ধ; ছোট্ট প্রার্থনাঘরে ঠাকুর,মা ও স্বামীজীর ছবি।শুরু হলো “খন্ডন ভব বন্ধন“। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হয়েছিল। ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী প্রায় সমস্ত রকম প্রার্থনাই নিঃশব্দে নীরবে অনুষ্ঠিত হয়। সকলের সাথে একযোগে সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে এই আরাধনা আমার কাছে নতুন। শুরুর দিকে সেই প্রার্থনায় আমার অংশগ্রহণ ছিল অনেকটা প্রাণের আনন্দে গান গাওয়ার মতো। সমবেত প্রার্থনার শেষে মিনিট খানেক বরাদ্দ ছিল ধ্যানের জন্য। আলো নিভে যাবার পর চুপটি করে বসে থাকার সময় ঠিক কি করব বুঝে উঠতে পারতাম না। ওই সময়টুকুতে নিজের আরাধ্য দেবতার উপর মন:সংযোগ করার নির্দেশ ছিল। কিন্তু আল্লা তো নিরাকার –তাঁর কোন ছবি বা মূর্তি তো আমি দেখিনি।তাই কাজটা আমার পক্ষে সহজ ছিল না। চোখ বন্ধ করলেই আমার চোখের সামনে হাজির হতেন আমার আব্বা ও মা। পরে, অনেক পরে বিদ্যাপীঠের এক সন্ন্যাসীর কাছে শিখেছিলাম জপ ও ধ্যানের পদ্ধতি। তখন অবাক হয়েছিলাম শুনে যে, আমি কোন ভুল করিনি। নিজের পিতা-মাতার বিগ্রহ অন্তরে জাগ্রত করার সেই চেষ্টা ধ্যানেরই এক রূপ। বিস্মিত হয়েছিলাম জেনে যে, নিরাকারেরও ধ্যান করা সম্ভব। ততদিন অবশ্য “খন্ডন ভব বন্ধন"-এর শুরু আমার প্রাণের মাঝে গেঁথে গেছে। আরেকটা সমস্যায় পড়েছিলাম প্রণাম করা নিয়ে। পাশাপাশি বন্ধুকে দেখতাম ঠাকুর, মা ও স্বামীজীর উদ্দেশ্যে তারা দুই হাত জোড় করে প্রণাম ও প্রার্থনা করত। অথচ ছোটবেলা থেকে আমি জানি মোনাজাত করার সময় দুই করলতলকে নিজের চোখের সামনে ধরে প্রার্থনা করতে হয়। আমি প্রার্থনা ঘরে বসে ঠিক মোনাজাতের ভঙ্গীতে শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের কাছে জীবনের নানাবিধ চাহিদা গুলো পেশ করতাম। পরে অবশ্য হাত জোড় করে প্রার্থনা করাটাও অভ্যাস হয়ে গেল। বেশ মনে আছে ঠাকুরের কাছে বড়সড় কিছু – যেমন বিকালের ফুটবল ম্যাচে ভালো খেলতে পারা-- চাওয়ার থাকলে করতলে মোনাজাত আর করজোড়ে প্রার্থনা দুটোই করতাম। কেমন যেন মনে হতো, ঠাকুর নিশ্চয়ই অন্যদের থেকে আমাকে বেশি দয়া করবেন। এমনি করে কাটতে লাগলো দিন। কখন যেন আমার চিন্তনে চিরকালের জন্য জায়গা করে নিলেন ঠাকুর, মা ও স্বামীজী। পুরুলিয়া থেকে বেলুড় বিদ্যামন্দির, তারপর নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন— ছাত্রজীবনে আমার দিনলিপি তেমন একটা বদলায়নি। ছুটিতে বাড়ি ফিরলে দু-একজন আত্মীয় আসতেন দেখতে – আমি সত্যিই কাফেরে পরিণত হলাম কিনা। অনেক প্রশ্ন তাদের – তোকে পূজা করতে হয়? তোরা সকলে একসাথে খাস? তোর সাথে সন্ন্যাসীরা ভালো ব্যবহার করে? – শুনে প্রথম প্রথম ভারী রাগ হতো। একটু বড় হওয়ার পর আমি ঠান্ডা মাথায় উত্তর দেবার চেষ্টা করতাম। কথামৃতের গল্প, সারদামায়ের জীবনী, স্বামীজীর উক্তি –এইসব কিছুর উল্লেখ করে বোঝানোর চেষ্টা করতাম সেই অহৈতুকি ভালবাসা, যার টানে আমি রোজ বসতাম শান্ত ওই দুই নয়নের প্রার্থনায়। জানি না আত্মীয়রা কতটা বুঝতেন,কিন্তু আমার পিতামাতা পরম নিশ্চিন্ততায় ঐ আলোচনায় অংশ নিতেন। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন আমি ভুল বলছিনা। ঈদের সময় সাধারণত: বাড়ি ফিরে আসতাম। কিন্তু আমার জন্য রামকৃষ্ণ মিশনে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল মহরম। তাজিয়া দেখা বা লাঠি চালানো - এসব অবশ্য সেখানে সম্ভব ছিল না। কিন্তু প্রায় প্রতি বছর সন্ধ্যাবেলায় যে ছোট্ট অনুষ্ঠান আমাদের হস্টেলে হতো তাতে প্রধানতম ভুমিকা ছিল আমার। শুরুতেই মর্সিয়া নামে বাংলাদেশ থেকে আসা আমার সহপাঠী গান গাইত। আর তারপরেই থাকত আমার দীর্ঘ বক্তব্য, যাতে আমি মহরমের পুরো গল্পটি বলতাম। দেখতাম, সকলে খুব মন দিয়ে শুনছে। সেকারণেই বোধহয় প্রতি বছর আমার গল্প দৈর্ঘ্যে বেড়ে চলত। শেষ পর্যন্ত গল্পটি যুদ্ধ, চক্রান্ত, খুন, জখম--এসব নিয়ে একটি মিনি থ্রিলারে পরিণত হয়েছিল। মীর মোশারফ হোসেনের চেয়ে সেই গল্পে স্বপনকুমার বা এডগার এলান পোর ভাগ বেশি ছিল। শিক্ষকেরা ব্যাপারটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারতেন! কিন্তু এই ব্যাপারে তাঁদের কাছে প্রশ্রয়ই পেয়েছি। ছাত্রজীবনের সবটা যে ফুলে ঢাকা ছিল তা নয়। আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। সারা দেশ জুড়ে সেইসময় উত্তেজনা, দাঙ্গা, মৃত্যু। আমার কিছু বন্ধু হঠাৎ করেই যেন পাল্টে গেল। অকারণ উত্তেজনায় ঝগড়া করত এবং বেশিরভাগ ঘটনার কেন্দ্রে থাকত আমার "ধর্ম"। তাদের দুচোখ জুড়ে দেখতাম--বিদ্বেষ। তখনও রবীন্দ্রনাথ সেভাবে পড়িনি। জানতাম না যে, "ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরেছে সে জন অন্ধ" । দুই সম্প্রদায়ের এই দ্বেষ ও ঘৃণার কারণ পরে বুঝেছিলাম, সেটি ছিল পারস্পরিক জ্ঞানের অভাব। আমরা যদি পরস্পরকে জানি, বুঝি তবেই দূর হবে এই ঘৃণা। সেইসময় থেকে আজও চেষ্টা করি অন্যের ধর্ম, তার রীতিনীতি ও আচার-আচরণ জানতে,বুঝতে। চেষ্টা করি নিজের ধর্মকে অন্যের কাছে সহজবোধ্য করে তুলে ধরতে। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে আমার শিক্ষার অনেকটাই সম্পূর্ন হয় বিদ্যাপীঠের ইংরেজি শিক্ষকের মাধ্যমে। তাঁর কাছেই জেনেছিলাম, ইসলামের মূল কথাই হল প্রার্থনা। যত প্রার্থনা করা যায় ততই আল্লা দয়া করেন। বিশ্বের প্রায় সব ধর্মের মূলেই হয়ত এই কথাগুলি রয়েছে। আমার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল আশাতীত ভালো হয়েছিল। অত্যন্ত স্নেহশীল এক সন্ন্যাসী আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন," হ্যাঁরে তাজ, তুই এত ভালো রেজাল্ট করলি কি করে? নিশ্চয়ই তুই খুব প্রার্থনা করেছিস!" আসলে পরিশ্রম করেছিলাম প্রচুর, কিন্তু মোনাজাতের মতো করে যখন প্রার্থনা করতাম তখন দুই হাতের করতলের মাঝে ঠাকুরের শান্ত সেই দুটি চোখ খুঁজতাম। আমার আল্লা, আমার ঠাকুর সব তখন একাকার হয়ে যেত। আজও বিশ্বাস করি,সেই সুতীব্র প্রার্থনাই আমায় সফল করেছিল|| ছাত্রাবস্থাতে একবার মনে হয়েছিল দীক্ষা নেব। গুরু আমায় পথ দেখাবেন। তখন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ যিনি ছিলেন, শুনলাম তিনি পুরুলিয়া আসবেন দীক্ষা দিতে। বিশ্বাস ছিল মা আব্বা কেউই আপত্তি করবেন না। কিন্তু দিন যত এগিয়ে আসতে লাগলো, ততই আমার মনের উৎসাহ কমে আসতে লাগলো। দুবেলা প্রার্থনা করি, মনের সবটুকু দেওয়ার চেষ্টা করি ঠাকুরের পায়ে, কিন্তু দীক্ষা নেওয়ার ইচ্ছাটা আর রইলো না। পরে বুঝেছিলাম --আমার সময় হয়নি। সময় হলে নিশ্চিতভাবে আমি দীক্ষা পাওয়ার অধিকারী হবো। তবু আফশোস রয়ে গেছে। যেমনভাবে আরেকটা আফশোস রয়ে গেছে মন্দিরে আরতি করা নিয়ে। বড় ইচ্ছা ছিল, বিদ্যাপীঠের মূল প্রার্থনাঘরে ঠাকুরের মর্মর মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর আরতি করব। চামর দুলিয়ে আমার সমস্ত শ্রদ্ধা, সব ভালবাসা নিবেদন করব তাঁর চরণে। আমার পিছনে গান ভেসে আসবে --"জয় জয় আরতি তোমার, হর হর আরতি তোমার, শিব শিব আরতি তোমার"। সে-সাধ মেটেনি। বীজমন্ত্র আমি পাইনি। আর সে-মন্ত্র ছাড়া আরতি সম্ভব নয়। স্বামীজি বলেছিলেন, ইসলামীয় শরীর এবং বৈদান্তিক মস্তিষ্কের কথা। রামকৃষ্ণ মিশনে প্রিয় শিক্ষক বারে বারে মনে করিয়ে দিতেন সে-কথা। তখন পুরোপুরি বুঝিনি। আজ যখন চারপাশের জগতের দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি এই সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা। আক্ষরিকভাবে এবং রূপকার্থে --উভয়ভাবেই সেই সমন্বয়ের সুযোগ আমি পেয়েছি। মহীরুহ হয়ে ওঠার সুযোগ আর নেই। তবু এখনো ভালো ছাত্রকে এগিয়ে দিই নিজ সংগ্রহের "শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত"। দরিদ্র আদিবাসী ছাত্রকে পড়তে দিই স্বামীজীর রচনার সেই অংশ --যেখানে রয়েছে দরিদ্র আইরিশ মানুষদের কথা, যারা পজিটিভ চিন্তার ছোঁয়ায় নতুন করে বেঁচে উঠেছিল। চেষ্টা করি ধ্যানস্থ মানুষটির শান্ত সেই দু-নয়নকে নিজের অন্তরে খুঁজে পাওয়ার ||" #🙏ভক্তি
#

🙏ভক্তি

🙏ভক্তি - ShareChat
491 জন দেখলো
3 মাস আগে
অন্য কোথাও শেয়ার করুন
Facebook
WhatsApp
লিংক কপি করুন
মুছে ফেলুন
Embed
আমি এই পোস্ট এর বিরুদ্ধে, কারণ...
Embed Post