দক্ষিণেশ্বর থেকে নির্বাসিত এক পরমহংস: বাঙালির অমর্যাদার এক কালো অধ্যায়
...............................................
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবন মানেই আমাদের কাছে কেবল দক্ষিণেশ্বরের আনন্দময় উৎসব আর আধ্যাত্মিক সংলাপ। তিনি আমাদের কাছে কল্পতরু। তিনি আমাদের প্রাণের ঠাকুর।
কিন্তু এর সমান্তরালে তাঁর শেষ জীবনের যে এক করুণ, যন্ত্রণাদায়ক এবং উপেক্ষিত অধ্যায় আছে, তা নিয়ে আমরা খুব কমই আলোচনা করি।
আমরা শ্রীরামকৃষ্ণকে 'যুগাবতার' বলে পুজো করি, কিন্তু তাঁর রক্তমাংসের শরীরটি যে কী পরিমাণ লাঞ্ছনা আর শারীরিক কষ্ট সহ্য করেছিল, তা ভাবলে আজও শিউরে উঠতে হয়। যাঁর মুখ দিয়ে নিঃসৃত প্রতিটি কথা যেখানে অমৃতসমান ।
সেই গলাই শেষ পর্যন্ত তাঁর মহাপ্রয়াণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
১৮৮৫ সালের মাঝামাঝি। ঠাকুরের গলায় একটি ছোট্ট ক্ষত দেখা দিল। প্রথমে ভাবা হয়েছিল সাধারণ ঠান্ডা লাগা বা কথা বলার কারণে ঘা। কিন্তু ধীরে ধীরে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করল। আজকের পরিভাষায় যা ছিল 'গলা বা আলজিভের ক্যান্সার'। যে মানুষটি সারা জগৎকে আধ্যাত্মিক পুষ্টি দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি নিজে এক ফোঁটা জল বা এক চামচ পায়েস গিলতে গিয়ে যন্ত্রণায় নীল হয়ে যেতেন। অথচ তাঁর ঠোঁটের কোণে হাসি ম্লান হয়নি।
শ্রীরামকৃষ্ণের প্রাণ ছিলেন মা ভবতারিণী। দক্ষিণেশ্বরের মন্দির চত্বর ছেড়ে তিনি এক মুহূর্তও থাকতে পারতেন না। কিন্তু চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে জোর করেই সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় প্রথমে শ্যামপুকুর এবং পরে কাশীপুর উদ্যানবাটীতে। মা ভবতারিণীর পুজো থেকে এই যে বিচ্ছেদ ছিল ঠাকুরের কাছে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দক্ষিণেশ্বরের সেই কালীমূর্তির পটের দিকে মন দিয়ে তাকিয়ে থাকতেন, যেন নিভৃতে অভিযোগ করছেন ,
"মা, আমাকে কেন দূরে সরিয়ে আনলি?"
মা সারদার আক্ষেপ করেছিলেন ,
"ঠাকুর যখন দক্ষিণেশ্বর ছাড়লেন, তখন বুঝলাম আনন্দের দিন শেষ। তিনি তো কেবল মা ভবতারিণীর সন্তান ছিলেন না, মা ছিলেন তাঁর নিশ্বাস।"
আজ আমরা তাঁকে নিয়ে মাতামাতি করি, কিন্তু সে সময় কলকাতার অনেক তথাকথিত 'বিদ্বান' সমাজ তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতে ছাড়েনি।
"যদি ঈশ্বরই হবেন, তবে নিজের রোগ সারিয়ে নিতে পারেন না কেন?"
এমন বিদ্রূপ তাঁকে হরদম শুনতে হতো। এমনকি অনেকে তাঁর অসুস্থতাকে তাঁর 'অসংযম' বা 'উন্মাদনা'র ফল হিসেবেও দাগিয়ে দিতে চেয়েছিল।
বাঙালি তাঁর আধ্যাত্মিক গভীরতা মাপতে গিয়ে তাঁর শরীরী যন্ত্রণাকে অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করেছিল।
নিজের রোগ নিয়ে ঠাকুর বলতেন ,
"মা-ই এই শরীরটা দিয়েছেন, মা-ই এতে রোগ দিয়েছেন। আমি তো যন্ত্র, মা যেমন চালাচ্ছেন তেমনই চলছি।"
কাশীপুর উদ্যানবাটীতে যখন ঠাকুর অসুস্থ, তখন তাঁর চিকিৎসার খরচ চালানোই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল। তাঁর ত্যাগী সন্তানরা বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে টাকা জোগাড় করতেন। অনেক সময় ভালো পথ্য বা চিকিৎসার সরঞ্জামটুকুও জুটত না। তৎকালীন কলকাতার সম্পন্ন সমাজ তখন ঠাকুরের খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
এই পুরো অধ্যায়ে মা সারদার ভূমিকা ছিল এক নিঃশব্দ ত্যাগের। তিনি আড়ালে থেকে ঠাকুরের জন্য পথ্য তৈরি করতেন, তাঁর ক্ষত পরিষ্কার করতেন। ঠাকুরকে দক্ষিণেশ্বর থেকে সরিয়ে আনার যন্ত্রণা সারদাদেবীও মর্মে মর্মে অনুভব করেছিলেন। শেষ জীবনে ঠাকুরের সেই শীর্ণ দেহ আর কথা বলতে না পারার কষ্ট বাঙালির কাছে কেবল এক 'অবতারের লীলা' হয়েই রয়ে গেল, তাঁর সত্যিকারের যন্ত্রণাটা আজও উপেক্ষিত।
১৮৮৬, ১৬ই আগস্ট এক নিঃশব্দ প্রস্থান ঘটলো।
সেই গভীর রাতে যখন ঠাকুর মহাসমাধিতে বিলীন হলেন, তখনো কলকাতার আকাশে-বাতাসে কোনো শোকের আবহাওয়া কিন্তু দেখা যায়নি তেমন।
সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ এবং তাঁর হাতেগোনা কয়েকজন তরুণ ভক্তের কাঁধে চেপে তাঁর নশ্বর দেহ গিয়েছিল কাশীপুর শ্মশানে। আজকের দিনে কোনো ধর্মগুরুর প্রয়াণে যে উন্মাদনা আমরা দেখি, সেদিন তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। ব্রিটিশ প্রশাসনের নথিতে কেবল একজন মন্দিরের পুরোহিত এর মৃত্যু হিসেবেই সেটি নথিবদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
মৃত্যুর পরবর্তীতেও অবহেলা পেয়েছেন ঠাকুর।
সবচেয়ে বড় বেদনার বিষয় হলো, তাঁর প্রয়াণের পর তৎকালীন সমাজ এবং দক্ষিণেশ্বর মন্দির কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রতি যে বিমাতৃসুলভ আচরণ করেছিল, তা ক্ষমার অযোগ্য।
মৃত্যুর পর যে ধরনের রাজকীয় শ্রদ্ধা বা বিদায় ঠাকুরের প্রাপ্য ছিল, বাঙালি সমাজ তা দিতে পারেনি। অনেক শিক্ষিত হিন্দু সমাজ তাঁর 'উন্মাদনা' বা 'অশিক্ষিত ভক্তি'কে ছোট করে দেখত।
ঠাকুরের মৃত্যুর পর মা সারদাকে যে পরিমাণ আর্থিক কষ্টের মুখে পড়তে হয়েছিল, তা আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত। কামারপুকুরের ভাঙা ঘরে শ্রী শ্রী মাকে নুন-ভাত খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে, অথচ বাঙালির কাছে শ্রীরামকৃষ্ণ তখন দেবতায় পরিণত হচ্ছেন।
ঠাকুরের মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যরা যখন মঠ গড়ে তুলতে চাইলেন, তখন এই বাঙালির সমাজই তাঁদের বিদ্রূপ করেছে, বাড়িতে আশ্রয় দিতে চায়নি।
বাঙালি শ্রীরামকৃষ্ণকে ভগবান বানিয়ে মন্দিরে বসিয়েছে সত্য, কিন্তু তাঁর সেই রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত গলা আর একাকী যন্ত্রণার ইতিহাসকে সযত্নে মুছে দিয়েছে। আমরা তাঁর 'লীলা' নিয়ে মাতামাতি করি, কিন্তু তাঁর 'যন্ত্রণা'কে স্পর্শ করতে ভয় পাই। দক্ষিণেশ্বর থেকে তাঁর সেই সরে আসা কেবল চিকিৎসার জন্য ছিল না, তা ছিল বাঙালির আধ্যাত্মিক দৈন্যের এক বড় প্রমাণ।
লিখতে গেলে চোখে জল আসে। আবার আজকালকার ভক্তির বহর দেখে হাসিও পায়। শেষ জীবনে ঠাকুর কি বলে গিয়েছিলেন তার শ্রেষ্ঠ ভক্ত বিবেকানন্দকে জানেন ??
বিবেকানন্দের প্রতি ঠাকুরের নির্দেশ ছিল....
"ওরে, শরীরটা তো শেষ হয়ে এল, এখন তোদেরই সব দেখতে হবে। মানুষ যেন না খেয়ে না মরে, সেটা দেখিস।"🙏🏻🙏🏻🙏🏻
সংগৃহীত
#🙏শ্রী রামকৃষ্ণপরমহংস দেব ও কল্পতরু🌷 #🌸জয় মা কালী🙏 #🙏ওম নম:শিবায়🔱 #🥰শ্রদ্ধা জানাই সব ধর্মকে🙂

