মাটির প্রদীপ
রুদ্র আর শ্রেয়া কলেজ জীবন থেকে একসঙ্গে। রুদ্র ছিল ভীষণ শান্ত আর অন্তর্মুখী, আর শ্রেয়া ছিল চঞ্চল, হাসিখুশি একটা মেয়ে। রুদ্রর একটা স্বভাব ছিল—সে নিজের মনের কষ্ট বা ভালোলাগা সহজে মুখে প্রকাশ করতে পারতো না, কিন্তু শ্রেয়ার ছোটোখাটো প্রতিটা প্রয়োজনের খেয়াল রাখতো সবার আগে। শ্রেয়া ঠাট্টা করে বলতো, "তুমি এত নিরস কেন বলো তো? একটা গোলাপ দিয়ে কোনোদিন একটু গুছিয়ে ভালোবাসার কথা বলতে পারো না?" রুদ্র শুধু মুচকি হাসতো।
মধ্যবিত্ত পরিবারের বড়ো ছেলে রুদ্রর কাঁধে ছিল অনেক দায়িত্ব। একটা সাধারণ চাকরিতে ঢুকে সে দিনরাত পরিশ্রম করতে শুরু করে, যাতে শ্রেয়াকে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে পারে। কিন্তু যান্ত্রিক এই ব্যস্ততার মাঝে শ্রেয়াকে দেওয়ার মতো সময় তার দিন দিন কমে আসছিল। শ্রেয়া ভাবতো, রুদ্র হয়তো বদলে গেছে, তার ভালোবাসা হয়তো ফুরিয়ে এসেছে।
অভিমানে, যন্ত্রণায় একদিন শ্রেয়া রুদ্রকে বলল, "যে সম্পর্কে একটু সময় নেই, দুটো ভালোবাসার কথা নেই, সে সম্পর্ক টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না রুদ্র। আমরা বোধহয় একে অপরের জন্য তৈরি হইনি।"
রুদ্র সেদিনও চুপ ছিল। শুধু শ্রেয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "ভালো থেকো শ্রেয়া।" কোনো জোরাজুরি করেনি, নিজের কোনো পরিস্থিতির অজুহাত দেয়নি।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর...
শ্রেয়া এখন বিবাহিত, তার নিজের একটা সংসার আছে। কিন্তু পুরনো সেই চেনা শহরের মেঠো পথ, বৃষ্টির দিনগুলো আর রুদ্রর সেই শান্ত মুখটা সে কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।
একদিন আচমকাই শ্রেয়ার ফোনে রুদ্রর মায়ের নম্বর থেকে একটা কল আসে। ওপাশ থেকে রুদ্রর মা শুধু ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। কেঁদে কেঁদে বললেন, "মা শ্রেয়া, রুদ্র আর নেই। গতকাল রাতে ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ও তোকে খুব মনে করতো রে মা, কিন্তু কোনোদিন তোর সুখে বাধা হতে চায়নি। যাওয়ার আগে তোর জন্য এই ডায়েরিটা ও আমার কাছে রেখে গেছে।"
শ্রেয়ার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। বুকফাটা কান্না চেপে সে ছুটে গেল রুদ্রদের বাড়ি। রুদ্রর নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখ দিয়ে জল উপচে পড়ছিল। রুদ্রর মা শ্রেয়ার হাতে একটা পুরনো নীল রঙের ডায়েরি তুলে দিলেন।
ডায়েরির পাতা থেকে...
ডায়েরির প্রথম পাতায় একটা শুকনো গোলাপ ফুল আর দুটো ট্রেনের টিকিট আঠা দিয়ে লাগানো। ডায়েরির ভেতরের লেখাগুলো পড়তে পড়তে শ্রেয়ার চারপাশটা ঝাপসা হয়ে আসছিল:
"১৩ই নভেম্বর: > আজ শ্রেয়া খুব রাগ করেছে আমি সময় দিতে পারিনি বলে। ও তো জানে না, ওর পছন্দের ওই লেহেঙ্গাটা আর একটা ছোট্ট আংটি কেনার জন্য আমি রাতে পার্ট-টাইম কাজ শুরু করেছি। একটু কষ্ট হোক, ওর মুখে হাসি দেখলে আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।"
"৪ঠা এপ্রিল (বিচ্ছেদের দিন): > শ্রেয়া আজ সম্পর্কটা ভেঙে দিল। ও ভাবল আমি ওকে ভালোবাসি না। আমি ওকে সত্যিটা বলতে পারলাম না। ডাক্তার আজই জানিয়েছেন আমার লিভারে থার্ড স্টেজের ক্যান্সার। আমার হাতে আর মাত্র কয়েকটা বছর সময় আছে। ভালোই হলো ও নিজেই চলে গেল। ও বেঁচে থাকুক ওর মতো করে। আমার মরার অপেক্ষায় ও কেন প্রতিটা দিন কাঁদবে? আমার ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, ও অন্য কোথাও অনেক সুখে থাকবে।"
"শেষ পাতা: > শ্রেয়া, আমি কোনোদিন মুখে বলতে পারিনি আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসতাম। একটা মাটির প্রদীপ যেমন নিজে পুড়ে চারপাশটাকে আলো দেয়, আমি শুধু চেয়েছিলাম আমার শেষ আলোটুকু দিয়ে তোমার জীবনটা ভরিয়ে দিতে। ভালো থেকো আমার চঞ্চল পাখি।"
ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরে রুদ্রর পায়ের কাছে বসে পড়ল শ্রেয়া। যে রুদ্রকে সে সারাজীবন 'পাথর' আর 'নিরস' ভেবে এসেছিল, সেই মানুষটাই নিজের বুকে কত বড়ো পাহাড়সম কষ্ট চেপে তাকে আড়াল করে রেখেছিল, তা জানার পর শ্রেয়ার কান্নার আজ আর কোনো সান্ত্বনা ছিল না।
গল্পটি আপনার কেমন লাগলো? মনের ভেতরের কোনো অনুভূতি কি নাড়া দিয়ে গেল?
লেখিকা -পাখি (আয়াত /বৃষ্টি )!😊💗 #😔ইমোশনাল স্ট্যাটাস😍 #📝আমার লেখা কবিতা✍ #😊সেরা কবিদের কবিতা✍️ #📃প্রেমপত্র📃 #📝আমার কথা - আমার কবিতায়😊


