কৃষ্ণকথা
ঠাকুরদার কুয়ো একজন লোক কোন গ্রামে বাস করত। সে রোজ বলত, “পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম।” লোকটার পিতামহ একটি কুয়ো খুঁড়ে গিয়েছিলেন। সেই কুয়োটির জল খুব মিষ্টি ও নির্মল ছিল। তিন পুরুষ পর অর্থাৎ সেই লোকটির সময়ে সেই দেড়শ বছরের পুরানো কুয়োর জল নষ্ট হয়ে গেছে। নানা নোংরা, পাঁক ও মরা ব্যাঙ পঁচে যাওয়াতে জল দুর্গন্ধ হয়ে গেছে। নানা রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে। সেই দূষিত জল পান করে লোকটির ছেলে, নাতি ও স্ত্রী বহু রোগে ভুগে ভুগে মারা গেল। তার-নিজেরও নানা ব্যাধি শুরু হল। প্রতিবেশীরা যখন তাকে বলত, “কুয়োর জল বাদ দিয়ে গঙ্গার জল ব্যবহার কর।” তখন লোকটি বলত, ‘না, না আমার বাপ-ঠাকুরদার কুয়ো, আমার বাপঠাকুরদা এই কুয়োর জল পান করে জীবন কাটিয়েছে। আমি কেন তা পান করব না ? সেই কুয়োটি লোপ করবার জন্য যখন সরকারী লোকজন এসে উপস্থিত হল, তখন লোকটি জোরে জোরে বলতে লাগল, “আমার বাপঠাকুরদার কুয়ো। এই বলতে বলতে সে এমন ভাব দেখাল যে, তার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কোনও রাজশক্তি সেই কুয়োর অস্তিত্ব লোপ করতে পারবে না। । হিতোপদেশ।  কোন কোন ব্যক্তিকে দেখা যায় তাঁরা কুলগুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেছেন। কুলগুরু আশ্রিত ব্যক্তিকে যদি বলা হয়,- “আমার বাপ-ঠাকুরদার গুরু আমার গুরু। তিনি পরম্পরা সূত্রে ভালই হোন, মন্দই হোন তবুও তিনি আমার গুরু।” অতীতে কোনও ভাল গুণ দেখে গোঁসাই- এর কাছ থেকে বাপ-ঠাকুরদার মন্ত্র নিয়েছেন। পরবর্তীকালে যদিও তার ব্যতিক্রম ঘটেছে, তবুও সেই কুলগুরুর আশ্রিত হতে হবে– এইরকম একগুয়ে যুক্তি, বাপ-ঠাকুরদার কুয়োতে পঁচা জল খেয়ে রোগ বাড়ানোর মতোই #কৃষ্ণকথা
বাক্ সিদ্ধ গুরুদেব একজন গুরুদেব একদিন বহুদূরে এক শিষ্যের বাড়ী রওনা দিয়েছেন। পথের মধ্যে মনে পড়ে গেল গীতা আনা হয়নি, শিষ্যের বাড়ীতে যদি গীতা পাঠ করতে হয় তাহলে তো বিপদে পড়ে যেতে হবে। গুরুদেব ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান। তাই তিনি বুদ্ধি করে পায়ের চটি দুটিকে একটি কাপড়ের মধ্যে বেঁধে শিষ্যের বাড়ীতে উপস্থিত হলেন। সকলে সন্ধ্যায় উপস্থিত হলেন গুরুদেবের মুখে গীতা শ্রবণ করার জন্য। গুরুদেব আসনে বসে কাপড়ে বাধা চটি দুটিকে সামনে রেখে গীতা বলে প্রচার করেন। এবং নিজেও প্রণাম করলেন। গুরুদেব মাত্র গীতাটির প্রথম শ্লোকটি মুখস্ত করেছিলেন। শ্লোকটি বলেই বললেন- “আমার শরীরটা ভাল নয়। আজ এইখানেই পাঠ শেষ করলাম। শ্রোতাগণ চলে যাওয়ার পর গুরুদেব রান্নার জন্য চলে গেলেন। এর মধ্যে সকলে হৈ-চৈ করে উঠল। -“গুরুদেব গীতা কুকুরে নিয়ে গেছে।” গুরুদেব কপালে হাত চাপড়ে বলে উঠলেন, “হায়! হায়! পবিত্র গীতা কুকুরে স্পর্শ করেছে, তোমরা গীতা উদ্ধার কর। আমি খুব দুঃখের সঙ্গে বলছি গীতা তুমি চটি হয়ে যাও।” এই কথা শুনে শিষ্যবর্গ গীতা উদ্ধার করে কাপড় খুলে দেখেন এক জোড়া চটি জুতা। সকলে অবাক হয়ে গুরুদেবের চরণে প্রণাম করে বললেন-“হে! বাকসিদ্ধ মহাত্মা। আপনি ছাড়া জগতের বুকে আর সদ্গুরু নাই। আপনার চরণে শতশতবার নমস্কার। । হিতোপদেশ। এই জগতে বহু হঠযোগী বাকসিদ্ধ রয়েছে। যারা পূর্বপূর্ব যুগে ভগবানের সঙ্গে যুদ্ধ করে সনাতন ধর্মের বিরোধিতা করে এসেছে, সেই অসুর সকলে কলিযুগে এসেছে, ভগবান গৌরহরির নির্মল প্রেমধর্মের বিরোধিতা করার জন্য। মহাপ্রভুর প্রেমধর্মের মধ্যে যুদ্ধের ব্যবস্থা নাই দেখে সেইসব অসুরগুলি মহাপ্রভুর বিরুদ্ধে এক একটি মত স্থাপন করে নিজে অবতার, বাকসিদ্ধ গুরুদেব, মহাত্মা, ইত্যাদি নাম প্রচার করে জগতের মানুষকে ধোকা দিতে লাগল। তারা বহু চাতুর্য্যরে দ্বারা মানুষকে বোকা বানিয়ে, মানুষকে ঠকিয়ে, ছলনা করে অর্থ সংগ্রহ করে স্ত্রী পুত্রাদির সেবায় লাগায়। তার ফলে যারা তাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে, তারা এবং তাদের গুরুদেবের নরকে গমন করতে হয়। #কৃষ্ণকথা
ফর্দ্দ অনুসারে গুরুসেবা এক গুরুদেব তাঁর শিষ্যকে নিয়ে একটি ঘোড়ায় চেপে ভ্রমণ করতে বের হলেন। যেতে যেতে ঘোড়ার পিঠ থেকে গুরুদেবের চাদরটি পড়ে যেতে দেখে শিষ্যটি ভ্রুক্ষেপও করল না। কিছুক্ষণ পর গুরুদেব বললেন, “আমার চাদর কোথায়?” শিষ্য বলল- “চাদরটি রাস্তায় পড়ে গেছে”। গুরুদেব বললেন- “দূর বোকা। চাদরটি তুলে নিবি তো। যাক, এখন থেকে যা পরবে তুই তা তুলে নিবি।” কিছুদূর যাওয়ার পর ঘোড়াটি পায়খানা করতে লাগল। শিষ্যটি তখন বলল, “গুরুদেব একটু দাঁড়ান। “গুরুদেব বললেন- “কেন”? কি হয়েছে ?” তৎক্ষণাৎ নেমে গিয়ে হাতে করে ঘোড়ার পায়খানা তুলে নিয়ে বলল- “গুরুদেব”। গুরুদেব বললেন- “বোকা ফেলে দিয়ে হাত ধুয়ে আয়।” শিষ্যটি বলল “ঘোড়ার” কি কি জিনিস পড়ে গেলে তুলতে হয়, তার একটি ফর্দ আমায় করে দিন। গুরুদেব ফর্দ করে দিলেন- “কাপড়, চাদর, ছাতা, জামা, ব্যাগ, আসন” ইত্যাদি। কিছুদূর যাওয়ার পর পথের মধ্যে একটি গর্ত দেখে ঘোড়াটি লাফ দেওয়ার ফলে গুরুদেব গর্তের মধ্যে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। শিষ্য তখন ফর্দ্দ অনুযায়ী সমস্ত জিনিসপত্র একত্র করতে লাগল। কাপড়, জামা, ব্যাগ, ছাতা, চাদর এমনকি গুরুদেবের অঙ্গ থেকে সবকিছু খুলে নিয়ে গুরুদেবকে উলঙ্গ অবস্থায় রেখে দিল। অনেকক্ষণ পর গুরুদেবের জ্ঞান আসলে তিনি বললেন, ‘আমাকে ধরে তোল।’ শিষ্যটি বলল ‘ফর্দে আপনাকে তোলার কথা নাই। সুতরাং আমি আপনাকে কি প্রকারে তুলব?” গুরুদেব বললেন,- ওরে, আমার পরনের কাপড়ের কি হল ?” শিষ্য বলল- “ফর্দ্দ অনুসারে সব গুছিয়ে রেখেছি।” । হিতোপদেশ।  ফর্দ্দ অনুসারে গুরু, বৈষ্ণব, ভগবানের সেবা হয় না। যা করলে বৈষ্ণব ভগবানের সুখ হয় তার নাম স্নেহময়ী সেবা। গুরু বৈষ্ণবের আনুগত্যে স্নেহময়ী সেবার দ্বারা গৌরগোবিন্দের সেবা করাই আত্মার বৃত্তি। #কৃষ্ণকথা
যাত্রাদলের নারদ যাত্রাওয়ালা ধীরেন অধিকারী মাসিক পঁচিশ টাকা মাইনে দিয়ে বাগদীকে তার যাত্রা দলে নিয়েছিলেন। কালী বাগদী দেখতে লম্বা চওড়া। তার গলার সুর মিষ্ট ছিল। তাকে নারদের অভিনয় করতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে খুব গাঁজা খেত। অন্যান্য দোষও ছিল। নানা নেশায় তার চোখ দুটো সর্বদা লাল হয়ে থাকত। আসলে সে কত রকমের হাবভাব দেখিয়ে বীণা বাজিয়ে গান করত। সাধারণ লোকে তাকে দেখে বলত-“আহা অরুন নয়নে জল, প্রেমে টলমল। ভক্তি আর কাকে বলে?” । হিতোপদেশ। যে ব্যক্তি সদগুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণের অভিনয় করে হৃদয়ে অন্য অভিলাষ পোষণ করে, সে নিজেকে ও লোককে বঞ্চনা করছে। যার ভক্তি, ভক্ত ও ভগবানের স্বরূপ সম্বন্ধে কোনও জ্ঞান নেই, অথচ নিজেকে অন্যের কাছে ভক্ত বলে জাহির করে, সে কপট ব্যক্তি। সে কামিনী, কাঞ্চন বা সম্মান লাভের জন্য যাত্রার দলের নারদের মতো ধার্মিকের বেশ গ্রহণ করে। কিন্তু তার কপটতা লোকে ধরে ফেলে। #কৃষ্ণকথা
লোক শিক্ষক প্রভুপাদ ১৯২২ সালে কাশিমবাজারের রাজা শ্রীযুক্ত মনীন্দ্র নন্দী একদিন নিজ বাসভবনে বিশাল বৈষ্ণব সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। সেই সভায় শ্রীযুক্ত নন্দী বিশেষ করে জগদ্্গুরু শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। সেখানে শ্রীল প্রভুপাদ চারদিন অমৃতময় হরিকথা পরিবেশন করেছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ দেখলেন সেই সভায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিগণ সকলেই বৈষ্ণব-ভেকধারী। তারা মাছ-মাংস-বিড়ি জর্দায় খুবই আসক্ত। সভা আরম্ভ হলে ভেখধারী বৈষ্ণবগণ আসতেন এবং সভা শেষে পালে পালে বেরিয়ে চলে যেতেন। তাঁদের হৃদয়ে বহুকালের কালিমা অনুলেপনের জন্য প্রভুপাদের অমৃতময় বাণী তারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারতেন না। যাই হোক চারদিন পর প্রভুপাদ শ্রীমায়াপুর ব্রজপত্তনমে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে শ্রীযুক্ত নন্দী মহাশয় জানতে পারলেন যে চারদিন শ্রীল প্রভুপাদ কিছুই ভোজন না করে উপবাসী ছিলেন। কেউ কেউ তাঁহাকে ভোজনের জন্য অনুরোধ করলে তিনি বলতেন নিষ্ঠাহীন, ভক্তিহীন বারোয়ারী স্থানে ভোজন করলে ভক্তি নষ্ট হয়, সেজন্য ভোজন করবেন না।” নন্দী মহাশয় অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে শ্রীমায়াপুরে শ্রীল প্রভুপাদের চরণে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং পরবর্তীতে শুদ্ধ ভক্ত হন। । হিতোপদেশ।  ভগবৎ ভক্তের অজ্ঞাতসারে সেবা করার ফলে মহান সুকৃতি লাভ হয় সত্য। কিন্তু নিজে অহংকারী হয়ে বসে থেকে লোকের দ্বারা সেবা করালে মারাত্মক অপরাধ হয়। যদি পরে নিজের অপরাধ বুঝতে পেরে বৈষ্ণবের শ্রীচরণের শরণাগত হয় তবে পরম করুণাময় সমস্ত অপরাধ থেকে মুক্ত করে ভগবৎ পাদপদ্মে নিবেদন করেন। #কৃষ্ণকথা
সাধুসঙ্গের ফল এক ভোমরা ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেল তার নিজের মত অন্য একটি পোকা মাটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভোমরা এসে বলল- ভাই তোমার এত দুর্দশা কেন? গোবরের পোকা বলল- কেন ভাই, আমার তো কোনো দুঃখ নাই। আমার বাসা এখানেই আছে। তুমি দয়া করে আমার বাড়ী এসো। ভোমরা আস্তে আস্তে গোবরের পোকার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল। তুমি কোথায় থাক ভাই! গোবরের পোকা বলল- আমি এই গোবরের গর্তের মধ্যে থাকি এবং গোবরের রস খাই। ভোমরা হো হো করে হেসে উঠল। বলল-ভাই তুমি আমার স্বজাতি হয়ে এত বোকা? তোমার দুঃখ তুমি কিছুই বুঝতে পারছ না? আমি কি করি জান? আমি সব ফুলের মধু খাই এবং গুন গুন করে গান গাই। সকলে আমার কত প্রশংসা করে। আমি এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পরিব্রাজকের মতো ঘুরে বেড়াই। তোমার দুঃখ-কষ্ট তুমি কিছুই বুঝতে পারছ না। তুমি আমার সঙ্গে চল, তোমায় ফুলের মধু খাওয়াব। আমি তোমার দুঃখ সহ্য করতে পারছি না।” গোবরের পোকা বলল- ভাই, আমি তোমার মতো উড়তে পারব না। কেমন করে যাব? ভোমরা বলল- তুমি আমার পিঠে ওঠ। আমি তোমায় বয়ে নিয়ে যাব। গোবরের পোকাকে এক কুমুদ পুষ্পে বসিয়ে দিয়ে বলল-“ভাই, যেমন করে তুমি গোবরের রস পান কর, ঠিক সেইভাবেই এই ফুলের মধু পান কর। আমি কয়েকটি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে আসি।” এদিকে প্রভাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুমুদ পুষ্প সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে গোবরের পোকা তার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে রইল। ভোমরা বন্ধুকে খুঁজে পেল না। এদিকে গ্রামের এক বালক শিব পূজার জন্য ফুল তুলতে এসে গোবরের পোকা সহ ফুলটা তুলে নিল। প্রতিদিনও পূজরী অগুরু চন্দন ও কর্পূর মিশ্রিত গন্ধের সহিত পুষ্প মিশ্রিত করে শিবমন্ত্রে অর্পণ করলেন। ক্রমানুসারে যে ফুলের মধ্যে গোবরের পোকাটি আছে, সেটিও “ইদম্ সগন্ধং পুষ্পং ওঁ নমো শিবায় নমঃ। শিবমন্ত্রে অর্পণ করলেন। পরদিন প্রাতঃকালে সেই সমস্ত ফুল গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে নতুন ফুল তুলতে গেল বালকটি। গঙ্গার স্রোতে ফুলগুলি ভাসতে ভাসতে চলল। গঙ্গার জলের স্পর্শ পেয়ে মহানন্দে পোকা বলতে লাগল-“আহা! আহা! আমার জন্ম এক গোবরের স্তুপের মধ্যে। আমি পূর্বার্জিত কোন সৌভাগ্যের ফলে এমন একজন সাধুর সঙ্গ লাভ করলাম, যার ফলে আমার পূর্বপুরুষ কেউ যা পাননি, সেই বৈষ্ণবপ্রবর মহাদেবের চরণে অর্পিত হলাম। তারপর ব্রহ্মারও দুর্লভ বস্তু যে ভগবৎ পাদপদ্ম থেকে প্রবাহিত গঙ্গা তা প্রাপ্ত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে, শুধু সেই সৎ বন্ধুর কৃপা বলে। জন্ম যখন হয়েছে তখন মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আমার এই মৃত্যু, উর্ধ্বগামী মৃত্যু। কেননা সাধুসঙ্গের প্রভাবে ভগবৎ পাদপদ্মে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। তাই শাস্ত্র বলেন- “সাধু সঙ্গ সাধু সঙ্গ সর্বশাস্ত্রে কয় লব মাত্র সাধুসঙ্গে সর্বসিদ্ধি হয়।” । হিতোপদেশ। আমারা এই দুর্লভ নর দেহ লাভ করে যদি সাধুসঙ্গ না করি তাহলে আমাদের জীবন বৃথা। শাস্ত্র বলেন- “সাধুসঙ্গে কৃষ্ণনাম এইমাত্র চাই। সংসার জিনিতে আর কোন বস্তু নাই। সাধুসঙ্গে কৃষ্ণভক্তে শ্রদ্ধা যদি হয়। ভক্তির ফল প্রেম হয় সংসার যায় ক্ষয়।” #কৃষ্ণকথা
শৃগাল বাসুদেব পৌন্ড্রক নামে এক রাজা শিবের ভক্ত ছিল। সে শিবের বরে অত্যন্ত বলশালী হয়। কিন্ত বর পেয়ে সে নিজেকেই ভগবান বলে জনসমাজে জাহির করতে থাকে। মূর্খ লোকেরা তার প্রভাব দেখে তাকে ভগবান বলে স্বীকার করতে থাকে। রাজা পৌন্ড্রক তার দুটি হাতের সঙ্গে আরও দুটি নকল হাত লাগিয়ে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম চার হাতে ধরে ভগবান বিষ্ণুর মতোই সেজে থাকল। একদিন সে তার শক্তিমত্তায় এমন উন্মত্ত হয়ে উঠল যে, সে শ্রীকৃষ্ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। সে শ্রীকৃষ্ণকে বলতে লাগল, সে ভন্ড। তোর চতুর্ভূজ ও শঙ্খ চক্র চিহ্নগুলি শিগগীর ত্যাগ কর। আমিই জগজ্জীবের উদ্ধারক ভগবান বাসুদেব। তুই কেন নিজেকে ভগবান বাসুদেব বলে অপপ্রচার করছিস। তুই সাবধান হ, যদি আমার কথায় আবাধ্য হোস্্, তা কর। তোকে বধ করেই প্রমাণ করব কে আসল ভগবান।” শ্রীকৃষ্ণ তার রংচং কৃত্রিম বেশভূষা দেখেই হাসতে লাগলেন। তারপর বললেন “পৌন্ড্রক! তোর সমস্ত অনুগামী সহ তোর গলাটা ছেদন করতে আমি বিশেষতঃ এই চক্র ব্যবহার করব।” অমনি প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হল। সেনাবাহিনীর মধ্যস্থলে আসল আর নকল দুই ভগবান একই রকম দেখাচ্ছিল। কে শ্রীকৃষ্ণ, কে পৌন্ড্রক বুঝে ওঠা মুশকিল ছিল। পৌন্ড্রকের সৈন্যই নিহত হল। যুদ্ধ শেষে পৌন্ড্রক রাজের বহু পত্নী এবং লোকজনেরা দেখতে পেল তোরণ দ্বারা একটি ছিন্ন মুন্ড পড়ে আছে। তারা ভাবল শ্রীকৃষ্ণকে বধ করা হয়েছে। পরক্ষণেই তারা বুঝল সে মুন্ডটি স্বয়ং মহারাজ পৌন্ড্রকের। তখন তারা মুন্ড ধরে কাঁদতে শুরু করল। । হিতোপদেশ। ভগবানের ভগবত্তা প্রকাশ পায়। নিজেকে ভগবান বলে জাহির করা ভক্তদের শক্তি সদ্ব্যবহার ভগবানের প্রীতি বিধানার্থে করা উচিৎ। তা না করে শক্তির অহমিকায় নিজেকে ভগবান বা হোমরা চোমরা বলে সমাজে প্রতিপন্ন করা উন্মত্ত ব্যক্তির লক্ষণ। #কৃষ্ণকথা
সংসার কপোত ও কপোতী নামে দুটি পাখি একত্র হইয়া সংসার পত্তন করে। একটি গাছে বহু যত্নে একটি বাসা বানিয়ে সুখে যৌনজীবন অতিবাহিত করতে থাকে। এর মধ্যে দুটি ডিম প্রসব করে তাতে তাপ দিতে থাকে। কয়েকদিন পর ঐ ডিম থেকে দুটি বাচ্চা হল। বাচ্চা দুটিকে দেখে কপোত ও কপোতীর আনন্দের সীমা রইল না। বহুদূর হইতে বহু কষ্টে খাদ্য সংগ্রহ করে বাচ্চা দুটির মুখে দেয়। একদিন এক ব্যাধ বাচ্চা দুটি ধরে জালের মধ্যে রেখে দিল। তারা আর বের হতে পারছে না। কপোতী মুখে আহার নিয়ে দেখল বাচ্চাদের দুরবস্থা। কপোতী আর থাকতে না পেরে সেই জালের মধ্যে ঢুকে গেল বাচ্চা দুটির কাছে। এদিকে কপোত এসে বাচ্চাদের ও কপোতীর দুর্দশা দেখে ধৈর্য্য রাখতে না পেরে কাঁদতে সেও জালের মধ্যে প্রবেশ করল। মহানন্দে ব্যাধ পাখিগুলি নিয়ে বাড়িতে চলল। এইভাবে পাখিগুলি তাদের জীবন হারাল। । হিতোপদেশ। মোহগ্রস্থ জীব সকল জানে না যে, তারা নিত্য-কৃষ্ণদাস। তাঁরা এই স্বরূপে ভুলে গিয়ে আমার পিতা, আমার মাতা, আমার পুত্র, আমার কন্যা এই দাবিতে তারা মোহান্ধ হয়ে পুনঃ পুনঃ সংসারে চক্রের মতো ঘুরছে। একেই বলে সংসার। তাই শাস্ত্র বলেনঃ “জীবের স্বরূপ হয় নিত্য কৃষ্ণদাস কৃষ্ণের তটস্থা শক্তি ভেদাভেদ প্রকাশ।” #কৃষ্ণকথা
সতন্ত্র জীবন, দুঃখের জীবন একজন গুরুদেব এক শিষ্যকে নিয়ে দেশ ভ্রমণ করতে করতে এমন এক রাজ্যে এসে পৌছিয়েছেন, যেখানে সমস্ত জিনিসের এক দাম। লবনের যাই দাম সন্দেশেরও এই দাম। দেখে শুনে শিষ্য তো আনন্দে আত্মহারা। গুরুদেব বললেন-“যে দেশের রাজার ভাল-মন্দ, উচু-নীচু জ্ঞান নেই, সে দেশে থাকতে নেই। চলো! এখনই এদেশ ছেড়ে চলে যাই।” শিষ্য বলল-“না গুরুদেব। আমি যাব না। দুধ, দৈ, মাখন, ছানা, ফল-মূল, মিষ্টি-মিঠাই খাব, আর আনন্দে থাকব। আমি এমন দেশ ছেড়ে কখনই যাব না।”গুরুদেব চলে যাওয়ার সময় বলে গেলেন, যদি কোন দিন বিপদে পড়, তাহলে আমাকে জানাবে। শিষ্য লোভের বশবর্তী হয়ে খেয়ে খেয়ে মোটা হয়েছে। এদিকে এক বাড়ী ডাকাতি হয়েছে। অনেক অনুসন্ধান করে তারা এই লোভী শিষ্যটিকে ডাকাত বলে সনাক্ত করল। আসলে এ কিন্তু ডাকাত নয়। তারা মনে করল এই অপরিচিত লোকটি বেশ কিছুদিন যাবৎ এই অঞ্চলে আছে। এই লোকটি ছাড়া আর কারও কাজ নয়। তাকে রাজ দরবারে নিয়ে যাওয়া হল। রাজা বললেন- একে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদন্ড দাও।” লোভী শিষ্যকে জিজ্ঞাসা করা হল, তার কোন অভিলাষ আছে কিনা। সে বলল-“আমার গুরুদেবের সঙ্গে একবার দেখা করার ইচ্ছা।” রাজার আদেশে লোভী শিষ্যটিকে তার গুরুদেবের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। শিষ্যটি গুরুদেবের চরণ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল- গুরুদেব! এই বিপদ থেকে আপনি আমাকে উদ্ধার করুন। গুরুদেব তার সমস্ত কথা শুনে বললেন, “এখন তোমাকে বাঁচাবার কোন উপায় দেখছি না। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন- “হ্যাঁ! একটি পথ আছে। তোমাকে যখন ফাঁসি দিতে নিয়ে যাবে, আমিও তখন সেখানে যাব। আমি বলব আমাকে ফাঁসি দিন। তুমিও বলবে আমায় ফাঁসি দিন। রাজা জিজ্ঞাসা করলে বলব, এই মুহুর্তে যদি কারও রাজদন্ড হয়, সে বৈকুন্ঠে গমণ করবে। তা পঞ্জিকায় দেখে আপনার কাছে আসতে বাধ্য হলাম। তুমি বলবে, আমি মরব। আমি বলব, না, আমি মরব।” এই কথা শুনে শিষ্য চলে এল। রাজার লোক নির্দিষ্ট দিনে ফাঁসি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। এমন সময় গুরুদেব বগলে একটি পঞ্জিকা নিয়ে হন্ হন্ করতে করতে এসে উপস্থিত হলেন। এসেই বলতে শুরু করলেন,-“হে মহারাজ। আমার একটি নিবেদন শুনুন। আমি পঞ্জিকাতে দেখলাম এই শুভ লগ্নে যদি কাহারও রাজদন্ড হয়, সে বৈকুন্ঠ গমন করবে সুতরাং উহাকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে ফাঁসি দিন। শিষ্য বলে উঠল-“মহারাজ! এই শুভ লগ্নে আমায় মৃত্যুদন্ড দিন।” এইভাবে উভয়ে মৃত্যুর জন্য বায়না ধরলে মহারাজ ভেবে চিন্তা করে বললেন-“এমন শুভ লগ্ন ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। আমার পিতা বৃদ্ধ হয়েছেন। তিনি অসুস্থ অবস্থায় বহুদিন বিছানায় পড়ে আছেন। তাঁর জন্য রাজবাড়ীর সকলে বিরক্তি বোধ করছে। এই শুভলগ্নে পিতৃদেবকে ফাঁসি দিয়ে বৈকুন্ঠ পাঠানোই আমার পক্ষে শ্রেয়ঃস্কর।” মহারাজ উভয়কে ছেড়ে দিলেন এবং মহানন্দে তাঁর পিতৃদেবকে ফাঁসি দিয়ে চিরতরে বৈকুন্ঠে পাঠালেন। । হিতোপদেশ।  গুরুদেবের আনুগত্য ত্যাগ করে বা অবাধ্য হয়ে স্বতন্ত্র জীবন কখনও মঙ্গল হয় না। শুধুই বিপদ, দুঃখ ও মৃত্যুই সার করতে হয়। শ্রীগুরুদেব পরম করুনাময়। তিনি কোনও দিন শিষ্যের অমঙ্গল কামনা করেন না। আমরা যদি শ্রীগুরুদেবের শ্রীচরণে নিষ্কপটে শরণ গ্রহণ করি এবং তাহার আদেশ নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করি তাহলে অনায়াসে আমাদের ভগবৎ প্রাপ্তি হবে। #কৃষ্ণকথা
সবচেয়ে মূলবান বস্তু একসময় জীবন ঠাকুর নামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ সংসার নির্বাহে অসমর্থ হয়ে কাশীধামে শ্রীমন্মহাদেবের শরণাগত হন। বৈষ্ণবরাজ আশুতোষ তাঁর সাধনে সন্তুষ্ট হয়ে আদেশ দিলেন- “তুমি বৃন্দাবনে যাও। সেখানে সনাতন গোস্বামীর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু প্রার্থনা কর। তোমার বাসনা পূর্ণ হবে। জীবন ঠাকুর শ্রীল সনাতন গোস্বামীকে সেই কথা জানালে তিনি বললেন- “দেখ গিয়ে আবর্জনাগুলো নাড়াচাড়া করে।” আবর্জনার মধ্যে একটি উজ্জ্বল পরশমণি পেলেন তিনি। লোহাতে পরশমণির ছোঁয়া লাগালে লোহা সোনায় পরিণত হয়। অত্যন্ত মূল্যবান পরশমণি পেয়ে তিনি দ্রুত গতিতে মহানন্দে বাড়ীর দিকে রওনা হলেন। পরিশ্রান্ত হয়ে এক গাছের নীচে বসে চিন্তা করলেন- “আচ্ছা! সনাতন গোস্বামী এটি আবর্জনাতে ফেলে দিয়েছেন কেন? এবং আমি যে পরশমণি নিয়ে চলে আসলাম তাঁকে তো একবারও বললাম না ! তখন তিনি ফিরে এসে সনাতন গোস্বামীর চরণে প্রণত হয়ে বলতে লাগলেন- “এর চেয়ে নিশ্চয়ই আরও মূল্যবান বস্তু আপনার কাছে আছে, নইলে এটা আবর্জনাতে ফেলে দিয়েছেন কেন?” গোস্বামী বললেন- “তুমি সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু চাও?” জীবন ঠাকুর বললেন-“হ্যাঁ, মহাদেব শিব তাইতো বলেছেন, যে জন্যে আপনার পদপ্রান্তে আমি অধম এসেছি। ” সনাতন গোস্বামী বললেন-“তবে ওই পরশপাথরটি যমুনার জলে ফেলে দিয়ে স্নান করে এসো।” জীবন ঠাকুর তৎক্ষণাৎ গুরুদেবের আদেশ পালনে রত হলেন। তারপর সনাতন গোস্বামী তাকে হরিণাম মন্ত্র প্রদান করলেন। “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে”। এই পবিত্র দিব্য হরিনাম বৈষ্ণবের সর্বপেক্ষা মূল্যবান বস্তু। তুমি সর্বক্ষণ এই মহামন্ত্র কীর্তন কর। । হিতোপদেশ। যতই মূল্যবান বস্তু হোক না কেন, জড়জগতের সমস্ত বস্তুই ক্ষণস্থায়ী। এই জীবনও কালের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু ভগবৎ-প্রতিনিধির দেওয়া মহামন্ত্র জীবকে মহাকালের উর্ধ্বে উন্নীত করে ভগবানের নিত্য আনন্দময় ধামে নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং ভগবানের দিব্যনামই সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্যবান বস্তু। #কৃষ্ণকথা