এলো মা জগদ্ধাত্রী

এলো মা জগদ্ধাত্রী

#

এলো মা জগদ্ধাত্রী

মা এখনও আমাদের চাষা পাড়ার জগদ্ধাত্রী পুজোটা হয়? সেই রাতে বুড়িমাকে গয়না পরানোটা? ওমা হবে না কেন রে পাগল।আড়াইশো-তিনশো বছরের পুজো কি এমন বন্ধ করা যায়? তোমার মনে আছে মা আমি তোমাকে কি জ্বালাতন করতাম, ঠাকুর দেখতে নিয়ে যাবার জন্য। শিবানী দেবী আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে বললেন, সব মনে আছে। ওই স্মৃতি নিয়েই তো বেঁচে আছি রে। এই দ্যাখ তোর বাবা বিছানায় শুয়ে শুয়ে চিৎকার করছে।তুই ফোন করলে যে একটু নিশ্চিন্তে কথা বলবো তার উপায় নেই। বুড়োটা বলেই যাচ্ছে, তুমিই কি খোকার সাথে সব কথা বলে নেবে? আগে বাবার সাথে কথা বল ,তারপর আমি বলছি। এই নাও, বেশি কথা বলো না। ফোনে অনেক বিল উঠবে খোকার। সুদূর জার্মানী থেকে ফোন করেছে শিবানী দেবী আর মনোময় বাবুর একমাত্র সন্তান অনিক মুখার্জী। সে এখন জার্মানীর বাসিন্দা। তার স্ত্রী বাঙালি হলেও বাংলা বলে কম। ছেলে অরিন তো পুরোদস্তুর ওদেশীয় হয়ে গেছে। তবুও যাহোক ইংরাজিটা জানে। হ্যারে খোকা কবে বাড়ি ফিরবি? আমার মুখাগ্নি কে করবে রে? বাবার গলার অভিমানটা এত দূরে থাকা অনিকের কানে এসে ঝাপটা মারলো। প্রতিবারই বাবা অবুঝের মতোই এই কথাগুলো বলে। মা এসব বলে না, হয়তো মায়ের অভিমানটা আরো গাঢ়। বছর ছয়েক আগে গিয়েছিল লাস্ট কৃষ্ণনগর। ওর স্বপ্নের শহরে। ওই শহরের রাস্তায় এখনো হয়তো তো বাই সাইকেলের দাগ সুস্পষ্ট। সেই ওমেন কলেজের ছুটির সময় কালেকটারির সামনে মেয়েদের দেখার জন্য ওদের গর্ভমেন্ট কলেজের ছেলেদের অকারণ উঁকিঝুঁকি। সেই জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় পাত্রমার্কেট,জজ কোর্ট, চাষাপাড়ার মানুষের ভিড়ে রোল-ফুচকা সাঁটানো। মায়ের সাথে কৃষ্ণনগড়ের রাজবাড়ীর আদি পুজো দেখতে যাওয়া। সেই শহরে অনিক লাস্ট গিয়েছিল বছর ছয় আগে। তখনো অরিন হয়নি। বাবা মা অরিনকে শুধু ছবিতেই দেখেছে। আজ অরিন প্রায় বছর পাঁচেকের হলো। বাবার মুখে একটাই কথা, নাতি না দেখেই পৃথিবী ছাড়তে হবে। মা শুধু বলে, সাবধানে থাকিস, শীতকাল এলেই তো তোর আবার ঠান্ডা লাগে । প্রটেকশন নিস। আজ বাবাকে চমকে দিয়েই অনিক বললো, বাবা আমি আসছি...জগদ্ধাত্রী পুজোর তারিখটা ক্যালেন্ডার দেখে বলো। ওই সময়েই যাবো। ডায়াবেটিস, হাই প্রেশারে শরীরটা আজকাল একেবারেই দেয় না। পায়ের নিচের নার্ভগুলো অকেজো হতে শুরু করেছে আস্তে আস্তে। বেশিরভাগ সময়েই শুয়ে বসে থাকেন মনোময় বাবু। হঠাৎ যেন যুবা বয়েসের মতোই শরীরে জোর পেলেন উনি। ফোনটা শিবানীদেবীর হাতে ধরিয়ে দিয়েই বিছানা থেকে তড়াক করে লাফ দিলেন যেন। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে তারিখ দেখলেন। হ্যারে খোকা তুই তোর বাবাকে কি এমন বললি, যে তোর বাবা ওই পা নিয়ে ছোটাছুটি লাগিয়ে দিল। ফোনটা ততক্ষনে অনিকের স্ত্রী ইভা নিয়ে নিয়েছে। মা আমরা জগদ্ধাত্রী পুজোয় কৃষ্ণনগর যাচ্ছি। গিয়েই তোমার হাতের চিতল মাছ ,লাউ চিংড়ি খাবো। আনন্দে গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না আর শিবানী দেবীর। সত্যি !! বিশ্বাস করতেও যে কষ্ট হচ্ছে। নিজের সন্তান নিজের বাড়িতে আসবে সেটুকুও যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে মা হিসাবে। পুজোর সময় তো গোটা কৃষ্ণ নগর আলোর বন্যায় ভাসে। শুধু তাদের এই দোতলা বাড়িটাতেই রোজকার টিউবের সাদাটে আলোয় চিরাচরিত রূপ। দুই রোগগ্রস্ত বুড়ো বুড়ির স্মৃতি রোমন্থনেই কেটে যায় পুজোর রাত্রিগুলো। যদিও সমস্ত আলোচনাটা খোকাকে কেন্দ্র করে। সেই কবে খোকা পুজোর সময় বাজি ফোটাতে গিয়ে আঙুল পুড়িয়ে ফেলেছিল। কবে সেই লাল রঙের জামা পরে খোকাকে নায়কের মত লেগেছিল। এসবই থাকে ওদের দুজন প্রৌঢ়র সুখের আলোচনায়। আর তো মাত্র দিন পনেরো বাকি গো পুজোর... এর মধ্যে অনেক কাজ। আজকাল কোমরের বাতের জন্য দোতলার খোকার ঘরে প্রায় যাওয়ায় হয়না শিবানী দেবীর। প্রথমেই ঘরটাকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে ফেলতে হবে। মনোময় বাবু ভ্যান রিকশায় করে একটা বড় বাক্স নিয়ে ঢুকছেন। সঙ্গে দুজন ছেলে। অতিরিক্ত পরিশ্রমে উনি ঘামছেন ,তবুও মুখের হাসিটি অমলিন। বুঝলে শিবানী তোমার নাতিটি তো আবার সাহেব হয়েছে। সেকি গরমে থাকতে পারবে? তাই প্রথমে গেলাম ব্যাংকে, তারপর টাকা তুলে এসির দোকানে। তোমার নাতির ঘরে এই মেশিনটা লাগিয়ে দিই। ঠান্ডা হাওয়ায় যদি দুদিন ঠাকুমার কাছে থাকতে পারে। শিবানী দেবী বললেন, যা করার তাড়াতাড়ি করো। ওই ঘর আমি নতুন করে সাজাবো। ইলেকট্রিকের ছেলে দুটোকে বলতে বলতেই বহুদিন পরে সিঁড়িতে পা দিলেন মনোময় বাবু। আজকাল পায়ের জন্য সিঁড়ি চড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। রেলিংয়ে হাত দিয়ে মনের জোরে পায়ে চাপ দিলেন উনি। ইলেকট্রিকের ছেলে দুটোকে বলতে বলতেই উঠছেন, আরে আমার ছেলে তো জার্মানীতে থাকে , খুব মনখারাপ করে আমাদের জন্য,কিন্তু কাজের চাপে আসতে পারেনা। হঠাৎ বললো, জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন আসবে। হাতে সময় নেই...একটু তাড়াতাড়ি করে দাও। আর হ্যাঁ পুজোর একদিন আগে এসে গোটা বাড়িটাকে টুনি দিয়ে সাজিয়ে দিও কিন্তু। খোকা আগে এই পুজোর সময় আলো দিয়ে বাড়ি সাজাত। শিবানী দেবী নিজেই নিজেকে বলেন ,এই কদিন আর কোমরের ব্যাথা বলে শুয়ে থাকলে চলবে না কত কাজ। খোকা গুড়ের নাড়ু ভালোবাসে, নিমকী ভালোবাসে..ও দেশে তো শুধু অখাদ্য কুখাদ্য। বার্গার খেয়ে অফিস যাচ্ছে , মাগো। নিজের মনেই বকতে বকতে মিতাকে বললো, নারকেলগুলো কুঁড়ে রাখিস মিতা। এ বাড়িতে যেন সাজ সাজ রব পরে গেছে। কে বলবে এই বাড়িতে দুদিন আগেও দুজন অসুস্থ বুড়ো বুড়ি দিনরাত নিজেদের রোগ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে বসে থাকতো! সন্তানের একটা ফোন...আবার দেখা হবার খবরে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে পিতৃ-মাতৃ হৃদয়। সকাল থেকে রান্নাঘরে বেশ সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে। অন্য সব প্রতিবেশীদের বাড়ির থেকেও এবাড়িতে একটু বেশিই জাঁকজমক চলছে এবারের জগদ্ধাত্রী পুজোর নবমী সকালে। শিবানী দেবী রান্নায় ব্যস্ত। বাজার থেকে বেছে বেছে সেরা জিনিসগুলো কিনে এনেছে মনোময় বাবু। খোকা ছোটবেলায় মাছের কাঁটা বেঁচে খেতে পারতো না। কতবার অফিস যাবার আগে মনোময় বাবুর ওপর দায়িত্ত পড়তো খোকাকে মাছ বেছে খাইয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে। শিবানী ব্যস্ত থাকলে মনোময় বাবুও খোকাকে খাইয়ে দিতেন। আজ সব মনে পড়ে যাচ্ছে। স্টোর রুম পরিষ্কার করানোর সময় খোকার তিনচাকার সাইকেল টাকেও বের করে ধুয়ে মুছে রেখেছেন মন্ময় বাবু। নাতি চাপবে বলে। রান্নাঘর থেকেই চেঁচালো শিবানী দেবী। আমার রান্না প্রায় কমপ্লিট। তুমি স্নানটা করে নাও। সেই সময়েই ফোনটা বাজছে। বল খোকা, তোরা কলকাতায় নেমে পড়েছিস? আরেকটি হলেই হাত থেকে ফোনটা পরে যাচ্ছিল শিবানী দেবীর। কোনোমতে বললেন, বেশ ..আমি তোর বাবাকে বলে দিচ্ছি। ফোনটা কেটে দিয়েছে অনিক। শিবানী দেবী বোকার মতোই ফোনটা ধরে আছে। মনোময় বাবু বাথরুমে ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে বললেন, কি গো ওরা কলকাতা থেকে গাড়িতে উঠে পড়েছে? ধীর গলায় কান্না সামলে শিবানী দেবী বললেন, ওরা আসতে পারছে না। খোকার অফিসে কি সমস্যা হয়েছে ,তাই লাস্ট মোমেন্টে টিকিট ক্যানসেল করেছে। তোমাকে জানিয়ে দিতে বললো। গামছা কাঁধে নিয়েই সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন মনোময় বাবু। দিন বারোর পরিশ্রমের পরও এতটা ক্লান্ত হননি উনি। এই মুহূর্তে যেন মনে হচ্ছে সমস্ত অবসন্নতা ঘিরে ধরতে চাইছে ওকে। গোটা বাড়িটা টুনি দিয়ে সাজানো,কিন্তু তারা আর জ্বলবে না নিজের দপদপ ছন্দে। রান্নাঘরের চিতল মাছের সুবাস টা হঠাৎ করেই কেমন ভারী বাতাসে পরিণত হলো। নিশ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে শিবানী দেবীর। এতক্ষন দাঁড়িয়ে রান্না করার ফলে এখন কোমরের ব্যাথাটা কঁকিয়ে উঠলো। দুজন আশাহত মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। গ্র্যান্ড মা....গ্র্যান্ড পা... বলে একটা ফর্সা টুকটুকে ছেলে ওদের বাড়ির গেট খুলে ছুটতে ছুটতে ঢুকছে। শিবানী দেবী বললেন, ওমা এটা কে? এর ছবিই তো খোকা পাঠাতো তোমার মোবাইলে। ইয়েস.. আই এম অরিন। এন্ড ইউ আর মাই গ্র্যান্ড মা... রাইট? মনোময় বাবু আনন্দে কেঁদে ফেলে বললেন, ইয়েস... আই এম ইউর গ্র্যান্ড পা অলসো.. অরিন ভাঙা বাংলায় বললো, ডাদ্দু ... অনিক লাগেজ নিয়ে ঢুকছে , পিছিনে ইভা। গাড়িটার ভাড়া মেটাচ্চে অনিক। বাড়িতে ঢুকতেই শিবানী দেবী ছেলের কান মুলে বললেন, বাঁদর ছেলে...এ ভাবে বাড়ির কাছ থেকে ফোন করে মাকে ঠকালি... অনিক বললো, এই কানমোলাটা যে ওদেশে খুব মিস করছিলাম মা। তাই এটা পাবার লোভেই মিথ্যেটা বললাম মা। অরিন পাপার পানিসমেন্ট দেখে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো। এত বড় পাপাকেও কেও শাস্তি দিতে পারে এটা দেখেই ওর খুব ফুর্তি। বহুদিন বাদে কৃষ্ণনগরের জজ কোর্টের এই দোতলা বাড়িটা জগদ্ধাত্রী পুজোর দিনে আনন্দের কলরবে ভরে উঠেছে। মন্ময় বাবুর আর শিবানী দেবীর এত বছরের রোগ গ্রস্ত শরীরে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে এসেছে। অরিনের ডাদ্দু , থামমি ডাকের জোরেই হয়তো এটা সম্ভব হয়েছে। ওদের বুড়ো শরীরে যেন হঠাৎ বসন্তের আগমন ঘটেছে।
620 views
3 months ago
Share on other apps
Facebook
WhatsApp
Copy Link
Delete
Embed
I want to report this post because this post is...
Embed Post