যথার্থ গীতা
।। ওঁ শ্রী পরমাত্মনে নমঃ।। ( শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ) যথার্থ গীতা ।। অথ দশমোহধ্যায়ঃ।। দীর্ঘ বছর ব্যবধানের পর 'শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা'র শাশ্বত ব্যাখ্যা "যথার্থ গীতা" ব্যাখ্যাকার:-শ্রী পরমহংস স্বামী অড়গড়ানন্দজী মহারাজ। ন মে বিদুঃ সুরগণাঃ প্রভবং ন মহর্ষয়ঃ৷ অহমাদির্হি দেবানাং মহর্ষীণাং চ সর্বশঃ।।১০/২।। অর্জুন! আমার উৎপত্তি সম্বন্ধে দেবতা অথবা মহর্ষিগণ কেউই অবগত নন। শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন (জন্মকর্ম চ মে দিব্যং)-আমার সেই জন্ম এবং কর্ম অলৌকিক অর্থাৎ এই চর্মচক্ষুর দ্বারা তা দেখা অসম্ভব। সেইজন্য আমার আবির্ভাব সম্বন্ধে দেবতা ও মহর্ষি স্তরের পুরুষগণ অবগত নন। আমি সর্বপ্রকার দেবতা ও মহর্ষিগণের আদিকারণ। যো মামজমনাদিং চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্৷ অসম্মূঢ়ঃ স মর্ত্যেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।।১০/৩।। যিনি অজন্মা, অনাদি আমাকে, সমস্ত লোকের মহান্ ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করে জানতে পারেন, মরণধর্মা মনুষ্যমধ্যে সেই পুরুষ জ্ঞানবান্--অর্থাৎ অজ, অনাদি এবং সর্বলোকের মহেশ্বরকে উত্তমরূপে জানা জ্ঞান এবং এইরূপ যিনি জানেন, তিনি সর্বপাপ থেকে মুক্ত হন, তাঁর পুনর্জন্ম হয় না। বুদ্ধির্জ্ঞানমসম্মোহঃ ক্ষমা সত্যং দমঃ শমঃ৷ সুখং দুঃখং ভবোহভাবো ভয়ং চাভয়মেব চ।।১০/৪।। অর্জুন! নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি, সাক্ষাৎকারসহিত জ্ঞান, লক্ষ্যের প্রতি বিবেকপূর্বক প্রবৃত্তি, ক্ষমা, শাশ্বত সত্য, ইন্দ্রিয়সমূহের দমন, মনের শমন, অন্তঃকরণের প্রসন্নতা, চিন্তন-পথের কষ্ট, পরমাত্মার জাগৃতি, স্বরূপের প্রাপ্তিকালে সর্বস্বের লয়, ইষ্টের প্রতি অনুশাসনাত্মক ভয় এবং প্রকৃতি থেকে নির্ভয়তা এই সবই আমার থেকে উৎপন্ন হয়। অহিংসা সমতা তুষ্টিস্তপো দানং যশোহযশঃ৷ ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্ত এব পৃথগ্বিধাঃ।।১০/৫।। অহিংসা অর্থাৎ নিজ আত্মাকে অধোগতিতে যেতে না দেওয়ার আচরণ, সমতা অর্থাৎ যাঁর মধ্যে বৈষম্যভাব থাকে না, সন্তোষ, তপ অর্থাৎ মন এবং ইন্দ্রিয়সমূহকে লক্ষ্যের অনুরূপ তৈরী করা, দান অর্থাৎ সর্বস্বের সমর্পণ, ভগবৎপথে মান-অপমান সহ্য করা--এইরূপ প্রাণীগণের ভাব আমার থেকেই সম্পাদিত হয়। এইসকল ভাব দৈবী চিন্তন-পদ্ধতির লক্ষণ। মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারো মনবস্তথা৷ মদ্ভাবা মানসা জাতা যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ।।১০/৬।। সপ্তর্ষি অর্থাৎ যোগের সাতটি ক্রমিক ভূমিকা (শুভেচ্ছা, সুবিচারণা, তনুমানসা, সত্ত্বাপত্তি, অসংসক্তি, পদার্থাভাবনা ও তুর্যগা) এবং এদের অনুরূপ অন্তঃকরণ চতুষ্টয় (মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকার), তার অনুরূপ মন যা' আমার ভাব-এ ভাবিত এই সকল আমার সঙ্কল্পদ্বারা (আমার প্রাপ্তির সংকল্প থেকে এবং যা' আমার প্রেরণা থেকেই উৎপন্ন হয়, উভয়েই একে অন্যের পূরক) উৎপন্ন হয়। এই সংসারে এই সমস্ত (সম্পূর্ণ দৈবী সম্পদ্) এদেরই প্রজা; কারণ সপ্ত ভূমিকার সঞ্চারে 'দৈবী সম্পদ্' ভিন্ন অন্য কিছু নেই। এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ৷ সোহবিকম্পেন যোগেন যুজ্যতে নাত্র সংশয়ঃ।।১০/৭।। যে পুরুষ যোগকে ও আমার উপর্যুক্ত বিভূতি সকলকে সাক্ষাৎকারসহিত জানেন, সে স্থির ধ্যানযোগের মাধ্যমে আমাতে একীভাবে স্থিত হন। এতে কোন সন্দেহ নেই। বায়ুশূণ্য স্থানে যেরূপ প্রদীপের শিখা অকম্পিত হয়, যোগীর বিজিত চিত্তেও এই পরিভাষা। প্রস্তুত শ্লোকে 'অবিকম্পেন' শব্দটির অভিপ্রায় এই। অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে৷ ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ।।১০/৮।। সমস্ত জগতের উৎপত্তির কারণ আমি। আমার দ্বারাই জগৎ গতিমান। এইরূপ জেনে বিবেকীজন শ্রদ্ধা ও ভক্তিপূর্বক নিরন্তর আমারই ভজনা করেন। তাৎপর্য এই যে, যোগীদ্বারা আমার অনুরূপ যে প্রবৃত্তি হয়, তাকে আমি করি। তা আমারই কৃপা। মচ্চিত্তা মদ্গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরস্পরম্৷ কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ।।১০/৯।। অন্য কাউকে স্থান না দিয়ে নিরন্তর আমাতেই চিত্ত সংযোগ করেন, আমাকে প্রাণ অর্পণ করেছেন যাঁরা, তাঁরা সর্বদা পরস্পরের মধ্যে আমার প্রক্রিয়াগুলি বোধ করেন। আমার গুণগান করেই সন্তুষ্ট হন এবং নিরন্তর আমাতেই রমণ করেন। তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্৷ দদামি বুদ্ধিযোগং তং যেন মামুপযান্তি তে।।১০/১০।। নিরন্তর আমার ধ্যানে মগ্ন এবং প্রেমপূর্বক ভজনা করেন যাঁরা, আমি তাঁদের সেই বুদ্ধিযোগ অর্থাৎ যোগে প্রবেশ করতে যে বুদ্ধির প্রয়োজন হয় সেই বুদ্ধি প্রদান করি, যে বুদ্ধিদ্বারা তাঁরা আমাকে লাভ করেন। অর্থাৎ যোগের জাগৃতি ঈশ্বরের কৃপা। তেষামেবানুকম্পার্থমহমজ্ঞানজং তমঃ৷ নাশয়াম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা।।১০/১১।। তাঁদের উপর পূর্ণ অনুগ্রহ করবার জন্য আমি তাঁদের আত্মাতে একীভাবে স্থিত হয়ে, রথী হয়ে অজ্ঞান থেকে উৎপন্ন অন্ধকার জ্ঞানরূপ প্রদীপদ্বারা প্রকাশিত করে নষ্ট করি। অর্জুন উবাচ পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্৷ পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভুম্৷৷১২ আহুস্ত্বামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষির্নারদস্তথা৷ অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে।।১০/১৩।। ভগবন্! আপনি পরমব্রহ্ম, পরমধাম এবং পরম পবিত্র; কারণ আপনাকে সমস্ত ঋষিগণ সনাতন, দিব্যপুরুষ, দেবতাদেরও আদিদেব, অজন্মা এবং সর্বব্যাপী বলেন। পরমপুরুষ, পরমধামেরই পর্যায় দিব্যপুরুষ, অজন্মা ইত্যাদি শব্দ। দেবর্ষি নারদ, অসিত, দেবল, ব্যাস এবং স্বয়ং আপনি আমাকে তাই বলছেন। সর্বমেতদৃতং মন্যে যন্মাং বদসি কেশব৷ ন হি তে ভগবন্ব্যক্তিং বিদুর্দেবা ন দানবাঃ।।১০/১৪।। হে কেশব! আপনি আমাকে যা বলছেন, তা আমি সত্য বলে মনে করি। আপনার ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে না দেবতাগণ না দানবগণই জানেন। স্বয়মেবাত্মনাত্মানং বেত্থ ত্বং পুরুষোত্তম৷ ভূতভাবন ভূতেশ দেবদেব জগৎপতে।।১০/১৫।। হে ভূতগণের সৃষ্টিকর্তা! হে ভূতগণের ঈশ্বর! হে দেবদেব! হে জগৎস্বামিন্! হে পুরুষমধ্যে উত্তম! আপনি স্বয়ং নিজেকে জানেন অথবা যাঁর আত্মায় জাগ্রত হয়ে আপনি জানিয়ে দেন, তিনিই জানেন। সেটাও নিজেকে নিজেই জানা হল। বক্তুমর্হস্যশেষেণ দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ৷ যাভির্বিভূতিভির্লোকানিমাংস্ত্বং ব্যাপ্য তিষ্ঠসি।।১০/১৬।। আপনিই আপনার ঐ দিব্য বিভূতিগুলির সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে, যৎসামান্যও বাকী না রেখে বলতে সক্ষম, যে যে বিভূতিদ্বারা আপনি এই লোকসমূহ ব্যাপ্ত করে স্থিত আছেন। কথং বিদ্যামহং যোগিংস্ত্বাং সদা পরিচিন্তয়ন্৷ কেষু কেষু চ ভাবেষু চিন্ত্যোহসি ভগবন্ময়া।।১০/১৭।। হে যোগিন্! (শ্রীকৃষ্ণ যোগী ছিলেন) কিরূপে সতত আপনার চিন্তন করলে আমি আপনাকে জানতে পারব? হে ভগবন্! কোন কোন ভাবদ্বারা আমি আপনাকে স্মরণ করব? বিস্তরেণাত্মনো যোগং বিভূতিং চ জনার্দন৷ ভূয়ঃ কথয় তৃপ্তির্হি শৃণ্বতো নাস্তি মেহমৃতম্।।১০/১৮।। হে জনার্দন! আপনার যোগশক্তি এবং যোগের বিভূতি সম্বন্ধে পুনরায় বিস্তৃতভাবে বলুন। সংক্ষেপে বর্তমান অধ্যায়ের আরম্ভেই বলেছেন, পুনরায় বলুন; কারণ অমৃত তত্ত্ব প্রদানকারী এই বচন শ্রবণ করে আমার পরিতৃপ্তি হচ্ছে না। রাম চরিত জে সুনত অঘাহীঁ। রস বিশেষ জানা তিন্হ নাহীঁ।। (রামচরিতমানস, ৭/৫২/১) যতক্ষণ প্রবেশলাভ না হয়, ততক্ষণ অমৃত তত্ত্ব সম্বন্ধে জানার ব্যাকুলতা থেকেই যায়। প্রবেশের পূর্বেই যদি পথিক চিন্তা করেন যে, বহু জানা হয়েছে, তাহলে তিনি কিছুই জানতে পারেন নি। এতে প্রমাণ হয় যে, সেই ব্যক্তির পথ অবরুদ্ধ হয়ে আসছে। সেইজন্য সাধককে সাধনা সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ইষ্টের নির্দেশ পালন করা উচিত এবং তা আচরণে পরিণত করা উচিত। শ্রীভগবানুবাচ হন্ত তে কথয়িষ্যামি দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ। প্রাধান্যতঃ কুরুশ্রেষ্ঠ নাস্ত্যন্তো বিস্তরস্য মে।।১০/১৯।। কুরুশ্রেষ্ঠ অর্জুন! এখন আমি নিজের দিব্য বিভূতিসকল, তারমধ্যেও প্রধান-প্রধান বিভূতিসমূহ সম্বন্ধে তোমাকে বলব, কারণ আমার বিস্তৃত বিভূতির অন্ত নেই। অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ৷ অহমাদিশ্চ মধ্যং চ ভূতানামন্ত এব চ।।১০/২০।। অর্জুন! আমিই সর্বভূতের হৃদয়ে অবস্থিত সকলের আত্মা এবং সমস্ত ভূতের আদি, মধ্য এবং অন্ত আমিই অর্থাৎ জন্ম, মৃত্যু এবং জীবনও আমি। আদিত্যানামহং বিষ্ণুর্জ্যোতিষাং রবিরংশুমান্৷ মরীচির্মরুতামস্মি নক্ষত্রাণামহং শশী।।১০/২১।। অদিতির দ্বাদশ পুত্রমধ্যে আমি বিষ্ণু এবং জ্যোতিসমূহের মধ্যে আমি প্রকাশমান সূর্য। বায়ুর মধ্যে আমি মরীচি নামক বায়ু এবং আমি নক্ষত্রসমূহের মধ্যে চন্দ্র। বেদানাং সামবেদোহস্মি দেবানামস্মি বাসবঃ৷ ইন্দ্রিয়াণাং মনশ্চাস্মি ভূতানামস্মি চেতনা।।১০/২২।। বেদের মধ্যে আমি সামবেদ অর্থাৎ পূর্ণ সমত্ব প্রদানকারী গায়ন। দেবগণের মধ্যে আমি তাদের অধিপতি ইন্দ্র এবং ইন্দ্রিয়সকলের মধ্যে আমি মন; কারণ মন-নিগ্রহ হবার পরেই আমাকে জানা সম্ভব এবং প্রাণীদের মধ্যে আমি তাদের চেতনা। রুদ্রাণাং শঙ্করশ্চাস্মি বিত্তেশো যক্ষরক্ষসাম্৷ বসূনাং পাবকশ্চাস্মি মেরুঃ শিখরিণামহম্।।১০/২৩।। আমি একাদশ রুদ্রের মধ্যে শঙ্কর। শঙ্ক অরঃ স শঙ্করঃ অর্থাৎ সমস্ত শঙ্কা থেকে আমি মুক্ত। যক্ষ ও রাক্ষসগণের মধ্যে আমি ধনের স্বামী কুবের। অষ্টবসুর মধ্যে আমি অগ্নি এবং শৃঙ্গযুক্ত পর্বতসকলের মধ্যে আমি সুমেরু অর্থাৎ সমস্ত শুভের মিলন আমি। সেটাই সর্বোপরি শৃঙ্গ, কোন পর্বত শৃঙ্গ নয়। বস্তুতঃ এই সমস্তই যোগ-সাধনার প্রতীক, যৌগিক শব্দ। পুরোধসাং চ মুখ্যং মাং বিদ্ধি পার্থ বৃহস্পতিম্৷ সেনানীনামহং স্কন্দঃ সরসামস্মি সাগরঃ।।১০/২৪।। যাঁরা পুর রক্ষা করেন সেই পুরোহিতগণের মধ্যে আমি বৃহস্পতি, যার থেকে দৈবী সম্পদের সঞ্চার হয় এবং হে পার্থ! সেনাপতিগণের মধ্যে আমি স্বামী কার্তিকেয়। কর্মত্যাগকে কার্তিক বলে, যার আচরণ করলে চরাচরের সংহার, প্রলয় এবং ইষ্ট লাভ হয়। জলাশয়সমূহের মধ্যে আমি সাগর। মহর্ষীণাং ভৃগুরহং গিরামস্ম্যেকমক্ষরম্৷ যজ্ঞানাং জপযজ্ঞোহস্মি স্থাবরাণাং হিমালয়ঃ।।১০/২৫।। মহর্ষিগণের মধ্যে আমি ভৃগু এবং বাণীমধ্যে একাক্ষর ওঁকার, যা সেই ব্রহ্মের পরিচায়ক। যজ্ঞসকলের মধ্যে আমি জপরূপ যজ্ঞ। যজ্ঞ পরম-এ স্থিতি প্রদানকারী আরাধনার বিধি-বিশেষের চিত্রণকে বলে। স্থাবর পদার্থসমূহের মধ্যে আমি হিমালয়। শীতল, সম এবং অচল একমাত্র পরমাত্মা। যখন প্রলয় হয়েছিল, তখন মনু সেই শৃঙ্গেই বাঁধা পড়েছিলেন। আচল, সম এবং শান্ত ব্রহ্মের প্রলয় হয় না। আমি সেই ব্রহ্মের স্থিতি। অশ্বত্থঃ সর্ববৃক্ষাণাং দেবর্ষীণাং চ নারদঃ৷ গন্ধর্বাণাং চিত্ররথঃ সিদ্ধানাং কপিলো মুনিঃ।।১০/২৬।। সকল বৃক্ষের মধ্যে আমি অশ্বত্থ। অশ্বঃ--আগামীকালপর্যন্তও যার থাকা সম্বন্ধে স্থির করে বলা যায় না, এইরূপ [উর্ধ্বমূলমধঃ শাখম্ অশ্বত্থ(১৫/১)]- ঊর্ধ্বে পরমাত্মা যার মূল, নিম্নে প্রকৃতি যার শাখা, এইরূপ সংসারই বৃক্ষস্বরূপ, যাকে অশ্বত্থ বলা হয়েছে--সামান্য অশ্বত্থ বৃক্ষ নয় যে পূজা আরম্ভ করবেন। আমি দেবর্ষিগণের মধ্যে নারদ। গন্ধর্বগণের মধ্যে আমি চিত্ররথ অর্থাৎ গায়ন (চিন্তন) করার প্রবৃত্তিসমূহতে যখন স্বরূপ চিত্রিত হতে থাকে, সেই অবস্থা-বিশেষ আমি। সিদ্ধপুরুষগণের মধ্যে আমি কপিলমুনি। কায়াকেই কপিল বলে। এতে যখন একাগ্র হওয়া সম্ভব হয়, সেই ঈশ্বরীয় সঞ্চারের অবস্থা আমি। উচ্চৈঃশ্রবসমশ্বানাং বিদ্ধি মামমৃতোদ্ভবম্৷ ঐরাবতং গজেন্দ্রাণাং নরাণাং চ নরাধিপম্।।১০/২৭।। আমি অশ্বগণের মধ্যে অমৃত থেকে উৎপন্ন উচ্চৈঃশ্রবা নামক অশ্ব। সংসারের প্রত্যেকটি বস্তু বিনাশশীল। আত্মাই অজর-অমর, অমৃতস্বরূপ। এই অমৃতস্বরূপ থেকে যার সঞ্চার হয়, সেই অশ্ব আমি। অশ্বকে গতির প্রতিক বলা হয়। আত্মতত্ত্ব গ্রহণ করবার জন্য যখন মন সেই দিকে সচেষ্ট হয়, তখন একেই অশ্ব বলে। এইরূপ গতি আমি। হস্তিগণের মধ্যে আমি ঐরাবত নামক হস্তি। আমাকে মনুষ্যগণের মধ্যে রাজা বলে জানবে। বস্তুতঃ মহাপুরুষই রাজা, যার অভাববোধ নেই। আয়ুধানামহং বজ্রং ধেনুনামস্মি কামধুক্৷ প্রজনশ্চাস্মি কন্দর্পঃ সর্পাণামস্মি বাসুকিঃ।।১০/২৮।। আমি শস্ত্রসমূহের মধ্যে বজ্র। গাভীদের মধ্যে কামধেনু। কামধেনু এমন কোন গাভী নয়, যে দুধের পরিবর্তে মনের মত ব্যঞ্জন পরিবেশন করে। ঋষিদের মধ্যে বশিষ্ঠের কাছে কামধেনু ছিল। বস্তুতঃ গো ইন্দ্রিয়সমূহকে বলে। যে পুরুষগণ ইষ্টকে অনুকূল করতে সমর্থ হন, তাঁরাই ইন্দ্রিয়সমূহকে সংযত করতে পারেন। যাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ ইষ্টের অনুরূপ স্থির হয়ে যায়, তাঁর জন্য তাঁরই ইন্দ্রিয়সমূহ কামধেনু হয়ে যায়। প্রজননকারীদের মধ্যে আমি নতুন স্থিতি প্রকট করি। বরং একধরণের পরিস্থিতি থেকে আর এক ধরণের পরিস্থিতি, এইরূপ বৃত্তিগুলির পরিবর্তন হয়, এই পরিবর্তনের স্বরূপ আমি। সর্পগণের মধ্যে আমি বাসুকি। অনন্তশ্চাস্মি নাগানাং বরুণো যাদসামহম্৷ পিতৃণামর্যমা চাস্মি যমঃ সংযমতামহম্।।১০/২৯।। নাগগণের মধ্যে আমি অনন্ত অর্থাৎ শেষনাগ। জলচরগণের মধ্যে তাদের অধিপতি বরুণ এবং পিতৃগণের মধ্যে অর্যমা (অর্যমা নামক পিত্রেশ্বর) আমি। যম পাঁচ প্রকার যেমন--অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ। এসমস্ত পালন করে চলার পথে যে বিকারগুলি বাধা দেয়, সেগুলি ছেদন করাই অরঃ। বিকারগুলি শান্ত হলে পিতৃ অর্থাৎ ভূত-সংস্কার তৃপ্ত হয়, নিবৃত্তি প্রদান করে। শাসকগণের মধ্যে আমি যমরাজ অর্থাৎ উপর্যুক্ত পঞ্চযমের নিয়ামক। প্রহ্লাদশ্চাস্মি দৈত্যানাং কালঃ কলয়তামহম্৷ মৃগাণাং চ মৃগেন্দ্রোহহং বৈনতেয়শ্চ পক্ষিণাম্।।১০/৩০।। দৈত্যগণের মধ্যে আমি প্রহ্লাদ। (পর+আহ্লাদ--পরের জন্য আহ্লাদ) প্রেমই প্রহ্লাদ। আসুরী সম্পদযুক্ত ব্যক্তির মধ্যেই ঈশ্বরপ্রাপ্তির জন্য আকুলি-বিকুলি আরম্ভ হয়, এর পরেই পরম প্রভুর দিগ্দর্শন হয়, এইরূপ প্রেমোল্লাস আমি। গণনাকারীদের মধ্যে আমি সময়। এক, দুই, তিন, চার এইরূপ গণনা অথবা ক্ষণ-দিন-পক্ষ-মাস ইত্যাদি নয় বরং ঈশ্বরীয় চিন্তনে যে সময়টুকু ব্যতীত হয়, সেই সময়টুকু আমি। পশুগণের মধ্যে মৃগরাজ (যোগী ও মৃ + গ অর্থাৎ যোগরূপী জঙ্গলে গমন করেন) এবং পক্ষীগণের মধ্যে আমি গরুড়। জ্ঞানই গরুড়। যখন ঈশ্বরীয় অনুভূতি হয়, তখন এই মনই নিজ আরাধ্যদেবের বাহন হয়ে যায় এবং যখন এই মনই সংশয়েযুক্ত থাকে, তখন সর্প হয়ে দংশন করে, যোনির কারণ হয়। গরুড় বিষ্ণুর বাহন। যে সত্তা বিশ্বে অনুরূপে সঞ্চারিত, জ্ঞানসংযুক্ত মন তাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে, তার বাহক হয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন--আমি সেই মন, যে মন ইষ্টকে ধারণ করে। পবনঃ পবতামস্মি রামঃ শস্ত্রভৃতামহম্৷ ঝষাণাং মকরশ্চাস্মি স্রোতসামস্মি জাহ্নবী।।১০/৩১।। যারা পবিত্র করে, তাদের মধ্যে আমি বায়ু। শস্ত্রধারীগণের মধ্যে আমি রাম। (রমন্ত যোগিনঃ যস্মিন্ স রামঃ)। যোগী কার মধ্যে রমণ করেন? অনুভবে। ঈশ্বর ইষ্টরূপে যা নির্দেশ দেন, যোগী তার মধ্যে রমণ করেন। সেই জাগৃতির নাম রাম এবং সেই জাগৃতি আমি। মৎস্যগণের মধ্যে আমি মকর এবং নদীগুলির মধ্যে আমি গঙ্গা। সর্গাণামাদিরন্তশ্চ মধ্যং চৈবাহমর্জুন৷ অধ্যাত্মবিদ্যা বিদ্যানাং বাদঃ প্রবদতামহম্।।১০/৩২।। হে অর্জুন! সৃষ্টির আদি, মধ্য ও অন্ত আমি। বিদ্যার মধ্যে আমি অধ্যাত্মবিদ্যা। যা আত্মার আধিপত্য প্রদান করে, সেই বিদ্যা আমি। সংসারে অধিকাংশ প্রাণী মায়ার আধিপত্যেই বাস করে। রাগ, দ্বেষ, কাল, কর্ম, স্বভাব এবং গুণসমূহদ্বারা প্রেরিত। এদের আধিপত্য থেকে মুক্ত করে আত্মার আধিপত্য নিয়ে যায় যে বিদ্যা, তা আমি, যাকে অধ্যাত্ম বিদ্যা বলে। ব্রহ্মচর্চায় যে পরস্পর বাদ-বিবাদ হয়, তাতে যেটি নির্ণায়ক, এইরূপ বার্তা আমি। বাকী নির্ণয়গুলি তো অনির্ণীত থাকে। অক্ষরাণামকারোহস্মি দ্বন্দ্বঃ সামাসিকস্য চ৷ অহমেবাক্ষয়ঃ কালো ধাতাহং বিশ্বতোমুখঃ।।১০/৩৩।। আমি অক্ষরসমূহের মধ্যে অ কার অর্থাৎ ওঁকার এবং সমাসসকলের মধ্যে দ্বন্দ্ব নামক সমাস। সাধনার উন্নত অবস্থাতে মন যখন নিশ্চল হয়ে আসে তখন সাধক ইষ্টের সম্মুখীন হন। কোন ইচ্ছা বাকী থাকে না। এখানে স্বামী-সেবকের সংঘর্ষ রয়েছে; কিন্তু দ্বন্দ্বের এই অবস্থা ভগবানের কৃপা। আমি অক্ষয়কাল। কাল সদা পরিবর্তনশীল; কিন্তু সেই সময়, যা অক্ষয়, অজর, অমর পরমাত্মাতে স্থিতি প্রদান করে, সেই অবস্থা আমি। বিরাট স্বরূপ অর্থাৎ সর্বত্র ব্যাপ্ত আমি সকলকে ধারণ-পোষণ করি। মৃত্যুঃ সর্বহরশ্চাহমুদ্ভবশ্চ ভবিষ্যতাম্৷ কীর্তিঃ শ্রীর্বাক্ চ নারীণাং স্মৃতির্মেধা ধৃতিঃ ক্ষমা।।১০/৩৪।। আমি সকলের নাশক মৃত্যু এবং আমি ভাবী উৎপত্তির কারণ। নারীগণের মধ্যে আমি যশ, শক্তি, বাকপটুতা, স্মৃতি, মেধা অর্থাৎ বুদ্ধি, ধৈর্য এবং ক্ষমা। বৃহৎসাম তথা সাম্নাং গায়ত্রী ছন্দসামহম্৷ মাসানাং মার্গশীর্ষোহহমৃতূনাং কুসুমাকরঃ।।১০/৩৫।। গায়নের যোগ্য শ্রুতিসমূহের মধ্যে আমি বৃহৎসাম অর্থাৎ বৃহৎ-এর সঙ্গে সংযুক্ত, সমত্ব প্রদানকারী গায়ন অর্থাৎ এইরূপ জাগৃতি আমি। ছন্দ সমূহের মধ্যে আমি গায়ত্রী ছন্দ। মাসগুলির মধ্যে শীর্ষস্থ মার্গ আমি এবং যার মধ্যে সদা প্রফুল্লতা বিদ্যমান, এইরূপ ঋতু, হৃদয়ের এইরূপ অবস্থাও আমি। দ্যুতং ছলয়তামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্৷ জয়োহস্মি ব্যবসায়োহস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্।।১০/৩৬।। তেজস্বী পুরুষগণের তেজ আমি। আমি অক্ষক্রীড়া মধ্যে ছলনাকারিগণের ছল। তাহলে তো ভাল, অক্ষক্রীড়াতে কল-বল-ছল করে গেলেই হয়, তাই যখন ভগবান্। না, এরূপ নয়। এই প্রকৃতিই একরকম জুয়া। এই প্রকৃতি ছলনাময়ী। এই প্রকৃতির দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হবার জন্য প্রদর্শন ত্যাগ করে গুপ্তভাবে ভজন করে যাওয়াই ছল। আমি বিজয়ীগণের বিজয় এবং ব্যবসায়িগণের নিশ্চয় (যা দ্বিতীয় অধ্যায়ের একচল্লিশ শ্লোকে বলেছেন। এই যোগে নিশ্চয়াত্মক ক্রিয়া, বুদ্ধি ও দিক্ একটাই, এইরূপ ক্রিয়াত্মক বুদ্ধি আমি। সাত্ত্বিক পুরুষগণের ওজঃ এবং তেজ আমি। বৃষ্ণীনাং বাসুদেবোহস্মি পাণ্ডবানাং ধনঞ্জয়ঃ৷ মুনীনামপ্যহং ব্যাসঃ কবীনামুশনা কবিঃ।।১০/৩৭।। আমি বৃষ্ণীবংশে বাসুদেব অর্থাৎ সর্বত্র যিনি বাস করেন সেই দেব আমি। পাণ্ডবগণের মধ্যে আমি ধনঞ্জয়। পুণ্যই পাণ্ডু এবং আত্মিক সম্পত্তিই স্থির সম্পত্তি। পুণ্যদ্বারা প্রেরিত হয়ে আত্মিক সম্পত্তি যিনি সংগ্রহ করেন আমি সেই ধনঞ্জয়। মুনিগণের মধ্যে আমি ব্যাস। পরমতত্ত্বকে ব্যক্ত করার ক্ষমতা যাঁর মধ্যে বিদ্যমান, সেই মুনি আমি। কবিদের মধ্যে উশনা অর্থাৎ তাতে প্রবেশ প্রদান করেন যিনি, সেই কাব্যকার আমি। দণ্ডো দময়তামস্মি নীতিরস্মি জিগীষতাম্৷ মৌনং চৈবাস্মি গুহ্যানাং জ্ঞানং জ্ঞানবতামহম্।।১০/৩৮।। দমনকারীগণের মধ্যে দমন করার শক্তি আমি। জিগীষুগণের নীতি আমি। গোপনীয় ভাবসমূহের মধ্যে আমি মৌন এবং জ্ঞানিগণ সাক্ষাৎ করে যে জ্ঞান লাভ করেন সেই জ্ঞান আমি। যচ্চাপি সর্বভূতানাং বীজং তদহমর্জুন৷ ন তদস্তি বিনা যৎস্যান্ময়া ভূতং চরাচরম্।।১০/৩৯।। অর্জুন! সর্বভূতের উৎপত্তির কারণও আমি; কারণ স্থাবর বা জঙ্গম এমন কোন বস্তু নেই, যা আমা ব্যতীত সত্তাবান্ হতে পারে। আমি সর্বত্র ব্যাপ্ত। সকলেই আমারই সকাশ থেকে। যদ্যদ্বিভূতিমৎসত্ত্বং শ্রীমদূর্জিতমেব বা৷ তত্তদেবাবগচ্ছ ত্বং মম তেজোহংশসম্ভবম্।।১০/৪১।। যা যা ঐশ্বর্যযুক্ত, কান্তিযুক্ত এবং শক্তিযুক্ত বস্তু বিদ্যমান, তাদেরকে তুমি আমার তেজের এক অংশমাত্র থেকে উৎপন্ন জান। অথবা বহুনৈতেন কিং জ্ঞাতেন তবার্জুন৷ বিষ্টভ্যাহমিদং কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ।।১০/৪২।। অথবা অর্জুন! এত অধিক জানবার তোমার প্রয়োজন কি? আমি এই সম্পূর্ণ জগৎ এক অংশমাত্র দ্বারা ধারণ করে রয়েছি। যথার্থ গীতা হতে সংগৃহীত -- ভিজিট করুণ শ্রীমদ্‌ভগবদ্‌গীতা - যথার্থ গীতা - মানব-ধর্মশাস্ত্র: https://m.youtube.com/channel/UCQ_oRPYJiX1rtAClkD28s5g?itct=CCYQ6p4EIhMItP_m6eKJ5AIVZtVzAR0yzwHB&wlfg=true
#

যথার্থ গীতা

যথার্থ গীতা - শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা 5200 5200 5200 5200 5200 5200 5200 5209 _ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা থার্থ গীত৷৷ CL 5200 5200 5200 5200 5200 5200 5200 5200 5200 যথার্থ গীতা । স্বামী অড়গড়ানন্দ দীর্ঘ বছর ব্যবধানের পর শ্রীমদ্ভগবদগীতার শাশ্বত ব্যাখ্যা গুপ্ত BENGALI রূনর্ব - ধমর্শ - ShareChat
92 জন দেখলো
2 মাস আগে
।। ওঁ শ্রী পরমাত্মনে নমঃ।। ( শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ) যথার্থ গীতা ।। অথ ত্রয়োদশোহধ্যায়ঃ।। দীর্ঘ বছর ব্যবধানের পর 'শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা'র শাশ্বত ব্যাখ্যা "যথার্থ গীতা" ব্যাখ্যাকার:-শ্রী পরমহংস স্বামী অড়গড়ানন্দজী মহারাজ। শ্রীভগবানুবাচ ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে৷ এতদ্যো বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ ইতি তদ্বিদঃ।।১৩/১।। কৌন্তেয়! এই দেহটাই একটা ক্ষেত্র এবং যিনি একে উত্তমরূপে জানেন, তিনিই ক্ষেত্রজ্ঞ। তিনি এর মধ্যে আবদ্ধ নন বরং এর সঞ্চালক। সেই তত্ত্ববিদ্ মহাপুরুষগণ এইরূপ বলেন। ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত৷ ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজ্জ্ঞানং মতং মম।।১৩/২।। হে অর্জুন! তুমি সকল ক্ষেত্রের ক্ষেত্রজ্ঞ আমাকেই জানবে অর্থাৎ আমিও ক্ষেত্রজ্ঞ। ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ বিকারসহ প্রকৃতি এবং পুরুষকে তত্ত্বতঃ জানাই জ্ঞান, এইরূপ আমার অভিমত অর্থাৎ সম্যক্ রূপে তাদের জানাকে জ্ঞান বলে। মিথ্যা তর্ক-বিতর্ককে জ্ঞান বলে না। তৎ ক্ষেত্রং যচ্চ যাদৃক্চ যদ্বিকারি যতশ্চ যৎ। স চ যো যৎপ্রভাবশ্চ তৎসমাসেন মে শৃণু।।১৩/৩।। সেই ক্ষেত্র যেরূপ, যে যে বিকারযুক্ত, যে কারণে উৎপন্ন হয়েছে এবং সেই ক্ষেত্রজ্ঞ যিনি ও যে যে প্রভাবযুক্ত, সে সমস্ত সংক্ষেপে শোন। অর্থাৎ এই ক্ষেত্র বিকারযুক্ত, কোনো কারণে হয়েছে, পরন্তু ক্ষেত্রজ্ঞ কেবল প্রভাবসম্পন্ন হয়। আমিই বলছি--তা নয়, ঋষিগণও বলেন-- ঋষিভির্বহুধা গীতং ছন্দোভির্বিবিধৈঃ পৃথক্৷ ব্রহ্মসূত্রপদৈশ্চৈব হেতুমদ্ভির্বিনিশ্চিতৈঃ।।১৩/৪।। এই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের তত্ত্ব ঋষিগণ বহু প্রকারে বর্ণনা করেছেন। নানাপ্রকার বেদমন্ত্র দ্বারা বিভাজিত করে বলা হয়েছে এবং উত্তমরূপে নিশ্চিত যুক্তিযুক্ত ব্রহ্মসূত্রের পদসমূহদ্বারাও এই তত্ত্ব নির্ণীত হয়েছে। অর্থাৎ বেদ, মহর্ষি, ব্রহ্মসূত্র এবং আমি একই কথা বলছি। শ্রীকৃষ্ণ সেই কথাই বলছেন, যা এঁরা সকলেই বলছেন। মহাভূতান্যহঙ্কারো বুদ্ধিরব্যক্তমেব চ৷ ইন্দ্রিয়াণি দশৈকং চ পঞ্চ চেন্দ্রিয়গোচরাঃ।।১৩/৫।। অর্জুন! পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, জল, পাবক, গগন ও সমীর), অহঙ্কার, বুদ্ধি ও চিত্ত (চিত্তকে অব্যক্ত পরা প্রকৃতি বলা হয়েছে। অর্থাৎ মূল প্রকৃতির উপর আলোকপাত করা হয়েছে, যার মধ্যে পরা প্রকৃতিও সম্মিলিত, উপর্যুক্ত আটটিই অষ্টধা মূল প্রকৃতি) এবং দশ ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, ত্বক্, জিহ্বা, বাক্, পাণি, পাদ, উপস্থ ও পায়ু), মন ও ইন্দ্রিয়ের পঞ্চ বিষয় (রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ ও স্পর্শ)। ইচ্ছাঃ দ্বেষ সুখং দুঃখং সঙ্ঘাতশ্চেতনা ধৃতিঃ৷ এতৎক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারমুদাহৃতম্।।১৩/৬।। ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ-দুঃখ প্রভৃতিসংযুক্ত এই স্থূল দেহ পিণ্ড, চেতনা এবং ধৈর্য, এইরূপ এই সকল বিকারযুক্ত ক্ষেত্র সংক্ষেপে বর্ণিত হল। সংক্ষেপে ক্ষেত্রের স্বরূপ এটাই, যার মধ্যে ভাল-মন্দ যে বীজই বপন করা হয়, তা পরে সংস্কাররূপে প্রকাশিত হয়। দেহটাই ক্ষেত্র। এই সকলের সামূহিক সংঘাত এই পিণ্ডদেহ। যতক্ষণ এই বিকারগুলি থাকবে, ততক্ষণ এই পিণ্ডও থাকবে, কারণ এই দেহ বিকারগুলি দিয়ে তৈরী। অমানিত্বমদম্ভিত্বমহিংসা ক্ষান্তিরার্জবম্৷ আচার্যোপাসনং শৌচং স্থৈর্যমাত্মবিনিগ্রহঃ।।১৩/৭।। হে অর্জুন! মান-অপমানের অভাব, দম্ভশূণ্যতা, অহিংসা (নিজের এবং অন্যের আত্মাকে কষ্ট না দেওয়াই অহিংসা।) শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, নিজের আত্মাকে অধোগতিতে নিয়ে যাওয়া হিংসা ও তার উত্থান শুদ্ধ অহিংসা। এইরূপ পুরুষ অন্যান্য আত্মার উত্থান হেতু উন্মুখ থাকেন। হ্যাঁ, এর আরম্ভ হয় কাউকে কষ্ট না দেওয়া থেকে। এটা তারই একটা অঙ্গ। ক্ষমা, মন-বাণীর সরলতা, আচার্যোপাসনা অর্থাৎ শ্রদ্ধা-ভক্তিপূর্বক সদ্গুরুর সেবা এবং তাঁর উপাসনা, পবিত্রতা, অন্তঃকরণের স্থিরতা, মন এবং ইন্দ্রিয়সহ দেহের নিগ্রহ এই অবস্থার মধ্য দিয়েই ক্ষেত্রজ্ঞের সাধনা শুরু হয়। ইন্দ্রিয়ার্থেষু বৈরাগ্যমনহঙ্কার এব চ৷ জন্মমৃত্যুজরাব্যাধি দুঃখদোষানুদর্শনম্।।১৩/৮।। অসক্তিরনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদারগৃহাদিষু৷ নিত্যং চ সমচিত্তত্বমিষ্টানিষ্টোপপত্তিষু।।১৩/৯।। ইহলোক এবং পরলোকের দেখা-শোনা সমস্ত ভোগের প্রতি আসক্তির অভাব, অভিমানশূণ্যতা, জন্ম-মৃত্যু, বৃদ্ধাবস্থা, রোগ ও ভোগাদিতে দুঃখদোষের পুনঃপুনঃ চিন্তন, পুত্র, স্ত্রী, ধন ও গৃহাদিতে আসক্তির অভাব, প্রিয় এবং অপ্রিয়ের প্রাপ্তিতে সদা চিত্তের সমভাব (গৃহস্থের এই অবস্থার মধ্য দিয়েই ক্ষেত্রজ্ঞের সাধনা শুরু হয়।) ময়ি চানন্যযোগেন ভক্তিরব্যভিচারিণী৷ বিবিক্ত দেশসেবিত্বমরতির্জন সংসদি।।১৩/১০।। আমাতে (শ্রীকৃষ্ণ যোগী ছিলেন অর্থাৎ এইরূপ কোন মহাপুরুষে) অনন্য যোগে অর্থাৎ যোগের অতিরিক্ত অন্য কিছু স্মরণ না করে, অব্যভিচারিণী ভক্তি (ইষ্টের অতিরিক্ত অন্য কোন চিন্তন না আসা), নির্জনে বাস (জনসমূহে বাস করার আসক্তি না হওয়া)। অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যত্বং তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্৷ এতজ্জ্ঞানমিতি প্রোক্তমজ্ঞানং যদতোহন্যথা।।১৩/১১।। আত্মার অাধিপত্যের জ্ঞানে একরস স্থিতি এবং তত্ত্বজ্ঞানের অর্থস্বরূপ পরমাত্মার সাক্ষাৎকার--এই সকলকে জ্ঞান বলে এবং এর বিপরীত যা কিছু সমস্তই অজ্ঞান--এইরূপ বলা হয়েছে। সেই পরমতত্ত্ব পরমাত্মাকে সম্যকভাবে জানা জ্ঞান, এর বিপরীত সমস্ত কিছু অজ্ঞান। জ্ঞেয়ং যত্তৎপ্রবক্ষ্যামি যজ্জ্ঞাত্বাহমৃতমশ্নুতে৷ অনাদিমৎপরং ব্রহ্ম ন সত্তন্নাসদুচ্যতে।।১৩/১২।। অর্জুন! যা জানার যোগ্য এবং যা জেনে মরণধর্মা মানুষ অমৃত তত্ত্ব লাভ করে, তা উত্তমরূপে বলব। সেই আদিহীন পরমব্রহ্মকে না সৎ বলা হয়, না অসৎ বলা হয়; কারণ যতক্ষণ তিনি পৃথক্, ততক্ষণ তিনি সৎ এবং যখন মানুষ তাঁরমধ্যে সমাহিত হয়, তখন কে কাকে বলবে। এক বোধ থেকে যায়, দ্বিতীয় বোধ থাকে না। এইরূপ স্থিতিতে সেই ব্রহ্ম সৎও নন, আবার অসৎও নন, বরং যা স্বয়ংসহজ, তিনি তাই। সর্বতঃপাণিপাদং তৎসর্বতোহক্ষিশিরোমুখম্৷ সর্বতঃশ্রুতিমল্লোকে সর্বমাবৃত্য তিষ্ঠতি।।১৩/১৩।। সেই ব্রহ্ম সর্বদিক্ থেকে হস্ত-পদযুক্ত, সর্বদিক্ থেকে চক্ষু-মস্তক-মুখযুক্ত এবং সর্বদিক্ থেকে শ্রোত্রযুক্ত, কর্ণযুক্ত; কারণ তিনি সংসারে সকলের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে স্থিত। সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্৷ অসক্তং সর্বভৃচ্চৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ।।১৩/১৪।। তিনি সকল ইন্দ্রিয়ের বিষয় সম্বন্ধে অবগত, তা সত্ত্বেও তিনি ইন্দ্রিয় ব্যাপারে ব্যাপৃত নন। তিনি আসক্তিশূণ্য, গুণাতীত হয়েও সকলকে ধারণ-পোষণ করেন এবং সকল গুণের ভোক্তা অর্থাৎ এক-এক করে সকল গুণ নিজের মধ্যে লয় করে নেন। যেরূপ শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে যজ্ঞ এবং তপস্যার ভোক্তা আমি। শেষে সমস্ত গুণ আমাতে বিলীন হয়। বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ৷ সূক্ষ্মত্বাত্তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ।।১৩/১৫।। সেই ব্রহ্ম সকল জীবধারীর ভিতরে-বাইরে পরিপূর্ণ। চর ও অচররূপও তিনি। সূক্ষ্ম বলে তাঁকে দেখা যায় না, অবিজ্ঞেয়, মন-ইন্দ্রিয়ের অতীত এবং অতি কাছে ও দূরে তিনিই স্থিত। অবিভক্তং চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্৷ ভূতভর্তৃ চ তজ্জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ।।১৩/১৬।। সেই ব্রহ্ম অবিভাজ্য হয়েও সম্পূর্ণ চরাচর ভূতে বিভক্তরূপে প্রতীত হন। সেই জ্ঞাতব্য পরমাত্মা সর্বভূতের সৃষ্টিকর্তা, ভরণ ও পোষণকর্তা এবং শেষে সংহারকর্তা। জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে৷ জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্বস্য বিষ্ঠিতম্।।১৩/১৭।। সেই জ্ঞেয় ব্রহ্ম জ্যোতিসমূহেরও জ্যোতি, তম থেকে বহু ঊর্ধ্বে বলা হয়েছে। তিনি পূর্ণ জ্ঞানস্বরূপ, পূর্ণজ্ঞাতা, জ্ঞাতব্য এবং জ্ঞানদ্বারাই তাঁকে লাভ করা যায়। সাক্ষাৎকারের পর যা কিছু জানা যায়, তাকে জ্ঞান বলা হয়। এইরূপ জ্ঞানদ্বারাই সেই ব্রহ্মকে লাভ করা যেতে পারে। তিনি সকলের হৃদয়ে স্থিত। তাঁর নিবাসস্থান হৃদয়ে। অন্যত্র খুঁজলে তাঁকে পাওয়া যাবে না। অতএব হৃদয়ে ধ্যান এবং যোগাচরণের দ্বারাই সেই ব্রহ্মের প্রাপ্তির বিধান। ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চোক্তং সমাসতঃ৷ মদ্ভক্ত এতদ্বিজ্ঞায় মদ্ভাবায়োপপদ্যতে।।১৩/১৮।। হে অর্জুন! এইরূপ ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় পরমাত্মার স্বরূপ সংক্ষেপে বলা হল। যা' জানার পরে আমার ভক্ত আমার সাক্ষাৎ স্বরূপলাভ করেন। যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ যাকে ক্ষেত্র বলেছিলেন, তাকেই প্রকৃতি এবং যাঁকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলেছিলেন, তাঁকেই এখন পুরুষ বলে ইঙ্গিত করলেন-- প্রকৃতিং পুরুষং চৈব বিদ্ধ্যনাদী উভাবপি৷ বিকারাংশ্চ গুণাংশ্চৈব বিদ্ধি প্রকৃতিসম্ভবান্।।১৩/১৯।। এই প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়কেই অনাদি বলে জানবে এবং বিকারসকল ত্রিগুণ প্রকৃতি থেকেই উৎপন্ন বলে জানবে। কার্যকারণকর্তৃত্বে হেতুঃ প্রকৃতিরুচ্যতে৷ পুরুষঃ সুখদুঃখানাং ভোক্তৃত্বে হেতুরুচ্যতে।।১৩/২০।। কার্য এবং কারণের (যার দ্বারা শুভ কার্য করা হয়--বিবেক, বৈরাগ্য ইত্যাদি এবং অশুভ কার্য হওয়াতে কাম, ক্রোধ ইত্যাদি করণ) উৎপত্তির প্রধান কারণ প্রকৃতি বলা হয় এবং পুরুষ সুখ ও দুঃখের উপলব্ধির কারণ বলা হয়। পুরুষঃ প্রকৃতিস্থো হি ভূঙ্ক্তে প্রকৃতিজান্গুণান্৷ কারণং গুণসঙ্গোহস্য সদসদ্যোনিজন্মসু।।১৩/২১।। পুরুষ প্রকৃতিতে অবস্থিত হয়ে প্রকৃতিজাত গুণসমূহের কার্যরূপ পদার্থ সকল ভোগ করেন এবং এই গুণসমূহের সংযোগই এই জীবাত্মার উত্তম ও অধম যোনিতে জন্মগ্রহণের প্রধান কারণ। এই কারণ অর্থাৎ প্রকৃতির গুণসমূহের সঙ্গে সংযোগ সমাপ্ত হলেই জন্ম-মৃত্যু থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। উপদ্রষ্টানুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ৷ পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহেহস্মিন্পুরুষঃ পরঃ।।১৩/২২।। সেই পুরুষ উপদ্রষ্টা অর্থাৎ হৃদয়-দেশে অতি সমীপে, হাত-পা-মন যত সমীপে তার চেয়েও অধিক সমীপে দ্রষ্টারূপে স্থিত। তার প্রকাশে আপনি ভাল করুন, মন্দ করুন, তাতে তাঁর কোন প্রয়োজন নেই। তিনি সাক্ষীরূপে স্থিত। সাধনা-পথে সাধক যখন সঠিকভাবে সাধনা করে নিজের স্তর কিছুটা উন্নত করেন, তাঁর দিকে এগিয়ে যান তখন দ্রষ্টা পুরুষের ক্রম-পরিবর্তন হয়, তিনি 'অনুমন্তা'--অনুমতি প্রদান করতে শুরু করেন, অনুভব জাগিয়ে তোলেন। সাধনাদ্বারা আরও নিকটে এগিয়ে ঘনিষ্ঠ হলে সেই পুরুষ 'ভর্তা' রূপে ভরণ-পোষণ করেন, সাধকের যোগক্ষেমেরও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাধনা আরও সূক্ষ্ম হলে তিনিই 'ভোক্তা' হন। 'ভোক্তারং যজ্ঞ তপসাম্'--যজ্ঞ, তপস্যা যা' কিছু সম্ভব হয়, সমস্তই সেই পুরুষ গ্রহণ করেন, এবং যখন গ্রহণ করে নেন, তখন তার পরের অবস্থাতে 'মহেশ্বরঃ'--মহান্ ঈশ্বররূপে পরিণত হন। তিনি প্রকৃতির প্রভুরূপে প্রতিষ্ঠিত হন। কিন্তু এখনও প্রকৃতি জীবিত, তবেই তার প্রভু তিনি। এর থেকেও উন্নত অবস্থাতে সেই পুরুষ 'পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো'--যখন পরম-এর সঙ্গে সংযুক্ত হন, তখন তাঁকে পরমাত্মা বলা হয়। এইরূপে এই দেহে স্থিত হয়েও পুরুষ আত্মা 'পরঃ', প্রকৃতির অতীত। পার্থক্য এই যে শুরুতে দ্রষ্টারূপে ছিলেন, ক্রমশঃ উত্থান হতে-হতে পরম-এর স্পর্শ করে সাধকও পরমাত্মারূপে পরিণত হন। য এবং বেত্তি পুরুষং প্রকৃতিং চ গুণৈঃ সহ৷ সর্বথা বর্তমানোহপি ন স ভূয়োহভিজায়তে।।১৩/২৩।। এইরূপ যিনি পুরুষকে এবং গুণসমূহের সঙ্গে প্রকৃতিকে সাক্ষাৎকার করার পর জানেন, তিনি সমস্ত কর্ম করেও পুনর্বার জন্মগ্রহণ করেন না। একেই মুক্তি বলে। ধ্যানেনাত্মনি পশ্যন্তি কেচিদাত্মানমাত্মনা৷ অন্যে সাঙ্খ্যেন যোগেন কর্মযোগে ন চাপরে।।১৩/২৪।। হে অর্জুন! সেই (আত্মানম্)--পরমাত্মাকে কতকগুলি মানুষ (আত্মনা)--নিজের অন্তর্চিন্তনের সাহায্যে ধ্যানের দ্বারা (আত্মনি)--হৃদয়-দেশে-এ দর্শন করেন। কেউ কেউ সাংখ্যযোগদ্বারা (অর্থাৎ নিজের শক্তি বুঝে ঐ একই কর্মে প্রবৃত্ত হন।) এবং অন্যান্য বহু ব্যক্তি তাঁকে নিষ্কাম কর্মযোগ দ্বারা দর্শন করেন। সমর্পণ করে সেই নিয়ত কর্মে প্রবৃত্ত হন। প্রস্তুত শ্লোকে মুখ্য সাধন, ধ্যান। সেই ধ্যানে প্রবৃত্ত হবার ধারা দুটি সাংখ্যযোগ ও নিষ্কাম কর্মযোগ। অন্যে ত্বেবমজানন্তঃ শ্রুত্বান্যেভ্য উপাসতে৷ তেহপি চাতিতরন্ত্যেব মৃত্যুং শ্রুতিপরায়ণাঃ।।১৩/২৫।। পরন্তু অপর কেউ কেউ, যাঁদের সাধনার জ্ঞান নেই, তাঁরা এইরূপে জানতে না পেরে (অন্যেভ্যঃ)-অন্য যাঁরা তত্ত্বদর্শী মহাপুরুষ, তাঁদের কাছে শুনে উপাসনা করেন এবং তাঁরাও শুনে মৃত্যুরূপ সংসার-সাগরকে নিঃসন্দেহে অতিক্রম করেন। অতএব কোনরূপ কর্ম করতে না পারলে সৎসঙ্গ করুণ। যাবৎসঞ্জায়তে কিঞ্চিৎসত্ত্বং স্থাবরজঙ্গমম্৷ ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগাত্তদ্বিদ্ধি ভরতর্ষভ।।১৩/২৬।। হে অর্জুন! যা কিছু স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ উৎপন্ন হয়, সেই সকলই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগে উৎপন্ন হয় জানবে। সমং সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্৷ বিনশ্যৎস্ববিনশ্যন্তং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।।১৩/২৭।। যে পুরুষ বিনাশশীল চরাচর সর্বভূতে নির্বিশেষভাবে অবস্থিত অবিনাশী পরমেশ্বরকে দর্শন করেন, তিনিই যথার্থ দেখেন। অর্থাৎ সেই প্রকৃতির নাশ হবার পরেই তিনি পরমাত্মস্বরূপ, এর পূর্বে নয়। সমং পশ্যন্ হি সর্বত্র সমবস্থিতমীশ্বরম্৷ ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানং ততো যাতি পরাং গতিম্।।১৩/২৮।। সেই সমদর্শী পুরুষ সর্বত্র নির্বিশেষরূপে অবস্থিত পরমেশ্বরকে (তিনি যেরূপ, সেইরূপ) দর্শন করেন, সেইজন্য নিজে নিজেকে ধ্বংস করেন না। কারণ যা ছিল, তাই তিনি দেখেছিলেন সেইজন্য তিনি পরমগতি লাভ করেন। প্রকৃত্যৈব চ কর্মাণি ক্রিয়মাণানি সর্বশঃ৷ যঃ পশ্যতি তথাত্মানমকর্তারং স পশ্যতি।।১৩/২৯।। যে পুরুষ সকল কর্ম প্রকৃতি দ্বারাই সর্বপ্রকারে সংঘটিত হতে দেখেন অর্থাৎ যতক্ষণ প্রকৃতি বিদ্যমান, ততক্ষণ কর্ম হতে দেখেন এবং আত্মাকে অকর্তারূপে দেখেন, তাঁর দেখাটাই যথার্থ। যদা ভূতপৃথগ্ভাবমেকস্থমনুপশ্যতি৷ তত এব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা।।১৩/৩০।। যে কালে মানুষ পৃথক্ পৃথক্ ভূতসমূহের ভাব-এ এক পরমাত্মাকে প্রবাহিত, স্থিত দেখেন এবং সেই পরমাত্মা থেকে ভূতসকলের বিস্তার উপলব্ধি করেন, সেই কালে তিনি ব্রহ্মকে লাভ করেন। এই লক্ষণ স্থিতপ্রজ্ঞ মহাপুরুষের। অনাদিত্বান্নির্গুণত্বাৎপরমাত্মায়মব্যয়ঃ৷ শরীরস্থোহপি কৌন্তেয় ন করোতি ন লিপ্যতে।।১৩/৩১।। কৌন্তেয়! এই অবিনাশী পরমাত্মা অনাদি ও গুণাতীত, সেইজন্য তিনি দেহে অবস্থিত হলেও বাস্তবে কোন কর্ম করেন না এবং লিপ্ত হন না। যথা সর্বগতং সৌক্ষ্ম্যাদাকাশং নোপলিপ্যতে৷ সর্বত্রাবস্থিতো দেহে তথাত্মা নোপলিপ্যতে।।১৩/৩২।। যেমন সর্বব্যাপী আকাশ সূক্ষ্ম বলে লিপ্ত হয় না, তদ্রূপ সকল প্রকার দেহে অবস্থিত হয়েও আত্মা গুণাতীত বলে দৈহিক গুণসমূহে লিপ্ত হন না। যথা প্রকাশয়ত্যেকঃ কৃৎস্নং লোকমিমং রবিঃ৷ ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত।।১৩/৩৩।। অর্জুন! যেরূপ একমাত্র সূর্য সমগ্র জগৎকে আলোকিত করে, সেইরূপ এক আত্মা সমস্ত ক্ষেত্রকে প্রকাশিত করে। ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োরেবমন্তরং জ্ঞানচক্ষুষা৷ ভূতপ্রকৃতিমোক্ষং চ যে বিদুর্যান্তি তে পরম্।।১৩/৩৪।। এইরূপ যাঁরা ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পরস্পর প্রভেদ এবং প্রকৃতি ও তার বিকার থেকে মুক্ত হবার উপায় জ্ঞানরূপ নেত্রদ্বারা জ্ঞাত হন, সেই মহাত্মাগণ পরব্রহ্ম পরমাত্মাকে লাভ করেন। অর্থাৎ ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞকে জ্ঞানচক্ষু দ্বারা দেখা যায় এবং জ্ঞান সাক্ষাৎকারের পর্যায়ভুক্ত। যথার্থ গীতা হতে সংগৃহীত -- ভিজিট করুণ শ্রীমদ্‌ভগবদ্‌গীতা - যথার্থ গীতা - মানব-ধর্মশাস্ত্র: http://www.youtube.com/playlist?list=PL33EnkVgY6o-XRjn8mMT3QLVal1UOD4-J অথবা:-www.yatharthgeeta.com
#

যথার্থ গীতা

যথার্থ গীতা - ৫২ ০৫ ৫২০০ ৫২০০১ ৫২০০ ৫২০০ ৫২০০ ৫২০০ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা । শ্রীমদ্ভগবদগীতা । শ্রীমদ্ভগবদগীতা আমি যখন গীতা । ৫২০০ ৫২০০ ৫২০০ ৫২০০ ৫২০০ ৫২০০ ৫২০০ ৫২০০ ৫২০০ দীর্ঘ বছর ব্যবধানের পর শ্রীমদভগবদগীতার । শাশ্বত ব্যাখ্যা - ShareChat
114 জন দেখলো
2 মাস আগে
অন্য কোথাও শেয়ার করুন
Facebook
WhatsApp
লিংক কপি করুন
মুছে ফেলুন
Embed
আমি এই পোস্ট এর বিরুদ্ধে, কারণ...
Embed Post