## বরফের চূড়ায় রক্তের অক্ষরে লেখা ইতিহাস: কারগিল যুদ্ধ ১৯৯৯
১৯৯৯ সালের মে মাস। ভারতের চারপাশ তখন শান্ত, লাহোর বাসযাত্রার মাধ্যমে পাকিস্তান ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে এক নতুন আশার আলো দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সেই শান্তির আড়ালেই লাদাখের বরফাবৃত কারগিল, দ্রাস ও বাতালিক সেক্টরের ১৮,০০০ ফুট উঁচুতে তৈরি হচ্ছিল আধুনিক সামরিক ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য ও খাড়া পাহাড়ি যুদ্ধের (High Altitude Warfare) প্রেক্ষাপট।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮ হাজার ফুট উঁচুতে, যেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াও কষ্টকর, আর শীতকালে তাপমাত্রা নেমে যায় **মাইনাস ১০ থেকে মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে**—এমন এক দুর্গম পর্বতচূড়ায় ভারতীয় সেনা যখন যুদ্ধ জয় করেছিল, তখন তৈরি হয়েছিল অজস্র রূপকথা। কারগিল বিজয় গাথার এমন কিছু অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর ঘটনা, যা সাধারণ ইতিহাসের পাতায় আজও অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছে।
## ১. এক হারানো ইয়াক ও রাখালের দূরবীন: প্রথম কীভাবে উন্মোচিত হলো ষড়যন্ত্র?
কারগিল যুদ্ধের সূচনা কিন্তু কোনো স্যাটেলাইট বা রাডার পিকচারে হয়নি। এর নেপথ্যে ছিলেন এক সাধারণ স্থানীয ভুটিয়া রাখাল—**তাশি নামগিয়াল (Tashi Namgyal)**।
১৯৯৯ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তাশি তাঁর হারিয়ে যাওয়া ইয়াক বা চামরী গাই খুঁজতে দূরবীন নিয়ে পর্বতের ওপর ওঠেন। সেখানে তিনি জুম লেন্সে দেখেন, পাকিস্তানি পোশাক পরা একদল সশস্ত্র লোক পাহাড়ের ওপর বাঙ্কার খুঁড়ছে। সাধারণ কোনো চোরাচালানকারী ভেবে তিনি তা নিকটস্থ ৫৪ রাষ্ট্রীয় রাইফেলস এবং ৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সেনাশিবিরে জানান। ভারতীয় সেনা তখন টহলদার পাঠায় এবং আবিষ্কৃত হয় 'অপারেশন বদর'—যেখানে পাকিস্তানি সেনা আগেই ভারতের খালি পড়ে থাকা কৌশলগত পাহাড়ের চূড়াগুলো দখল করে বসেছিল।
## ২. পাহাড়ের খাড়া দেওয়ালে বোফোর্স: অভূতপূর্ব 'ডাইরেক্ট ফায়ারিং'
সামরিক ইতিহাসে আর্টিলারি বা কামানের গোলা বর্ষণ করা হয় একটি পরাবৃত্তাকার বা বাঁকানো পথে (Parabolic Arc), অর্থাৎ বহুদূরের অদৃশ্য কোনো লক্ষ্যবস্তুর ওপর পাহাড় ডিঙিয়ে গোলা ফেলা হয়। কিন্তু কারগিলে শত্রুরা একদম চূড়ার ওপর বাঙ্কারে বসে ছিল, যেখান থেকে তারা পুরো জাতীয় সড়ক (NH 1D) দেখতে পাচ্ছিল।
ভারতীয় সেনার আর্টিলারি রেজিমেন্ট তখন এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেয়। **বোফোর্স মিমি হাওইটজার (Bofors 155mm) এবং ফিল্ড গানগুলোকে প্রায় খাড়া ওপরের দিকে ৯০ ডিগ্রি কোণে সোজা করে স্থাপন করা হয়।**
* সমতলের কামানকে খাড়া পাহাড়ের বাঙ্কারের দিকে নিশানা করে সরাসরি প্লেইন সাইটে গোলা ছোড়া শুরু হয়, যাকে বলে **'Direct Fire'**।
* এটি বোফোর্স কামানের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ব্যবহার। বোফোর্সের একটানা প্রকম্পিত ধ্বংসাত্মক গোলাবর্ষণেই শত্রুপক্ষের মানসিক মনোবল ভেঙে পড়েছিল। কারগিল যুদ্ধে প্রায় **১ লক্ষ ২৬ হাজারের বেশি গোলা** বর্ষণ করা হয়েছিল, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোথাও দেখা যায়নি।
## ৩. ১৫টি গুলি শরীরে নিয়েও টাইগার হিল জয়: যোগেন্দ্র সিং যাদব
টাইগার হিল দখলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ১৮ গ্রেনেডিয়ার্সের ঘাতক প্লাটুনকে। এই প্লাটুনের অন্যতম সদস্য ছিলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সী তরুণ সিপাহী **যোগেন্দ্র সিং যাদব**।
খাড়া বরফের ১৬,০০০ ফুট পর্বত চড়তে তিনি রোপ-ক্লাইম্বিং করছিলেন। শত্রু ওপর থেকে একটানা মেশিনগান থেকে গুলিবৃষ্টি শুরু করে। প্লাটুনের কমান্ডারসহ প্রায় সকলেই শহীদ হন। যোগেন্দ্র সিং যাদবের শরীরে তখন লেগেছে **১৫টি গুলি**, তাঁর একটি হাত প্রায় শ্যাটার হয়ে ভেঙে ঝুলছিল।
* শত্রুরা তাকে মৃত ভেবে তাঁর শরীরের ওপর পা দিয়ে চলে যায়। কিন্তু অদম্য তেজ ও অলৌকিক জীবীবনী শক্তির বলে তিনি মৃতবৎ পড়ে থেকে শত্রুদের কথোপকথন ও পরবর্তী কৌশল শুনে নেন।
* শত্রুরা চলে যাওয়ার পর ঝুলন্ত হাতটিকে নিজের বেল্ট দিয়ে শক্ত করে বেঁধে তিনি আবার উঠে দাঁড়ান। তিনি হামাগুড়ি দিয়ে শত্রুর বাঙ্কারে ঢোকেন এবং নিজের অক্ষত হাত দিয়ে গ্রেনেড ছুড়ে পরপর দুটি বাঙ্কার ধ্বংস করেন।
* তাঁর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে টাইগার হিল পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি সর্বকনিষ্ঠ পরমবীর চক্র বিজয়ী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
## ৪. পাকিস্তানের 'শেরশাহ' এবং "ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর!"
কারগিল যুদ্ধের নাম এলে যে নামটা সবচেয়ে আগে মনে পড়ে, তা হলো ১৩ জ্যাক রাইফেলসের **ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা**। পাকিস্তানি মিলিটারি রেডিওতে বিক্রম বাত্রার কোড নেম দেওয়া হয়েছিল **'শেরশাহ'**।
পয়েন্ট ৫১৪০ দখলের পর যখন বিক্রম বাত্রা রেডিওতে তাঁর কমান্ডিং অফিসারকে বিজয়ের বার্তা জানান, তখন তিনি ব্যবহার করেছিলেন এক বিখ্যাত স্লোগান—**"ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর!"** (এই মন আরও চায়!)।
পরবর্তীতে পয়েন্ট ৪৮৭৫ দখলের সময়, পাকিস্তানি কমান্ডার রেডিওতে বিক্রম বাত্রাকে হুমকি দিয়ে বলেছিল, *"শেরশাহ, উপরে আসিও না, ধ্বংস হয়ে যাবে!"* বিক্রম বাত্রা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, *"দেখা যাক কে কার বিনাশ ডেকে আনে!"*
পয়েন্ট ৪৮৭৫ উদ্ধারের সময় এক আহত জুনিয়র সেনাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের শরীর দিয়ে আগলে ধরেন বাত্রা। সহযোদ্ধাকে নামিয়ে দেওয়ার সময় শত্রুর গুলি এসে লাগে তাঁর বুকে। শহীদ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেও তিনি চিৎকার করে বলে গিয়েছিলেন, *"জয় মাতা দি!"*
## ৫. ভারতীয় নৌবাহিনীর কাল্পনিক আতঙ্ক: 'অপারেশন তলোয়ার'
অনেকেই ভাবেন কারগিল যুদ্ধ কেবল স্থলসেনা এবং বিমানবাহিনীর (অপারেশন সাদা সাগর) যুদ্ধ ছিল। কিন্তু ভারতীয় নৌবাহিনী ব্যাকগ্রাউন্ডে এমন এক চাল ছেলেছিল, যা পাকিস্তানকে হাঁটু মুড়ে বসতে বাধ্য করেছিল।
নৌবাহিনী দ্রুত শুরু করে **'অপারেশন তলোয়ার'**। ভারতীয় নৌবাহিনীর ইস্টার্ন ফ্লিটের সমস্ত যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং বিমানবাহক জাহাজকে আরব সাগরে এনে করাচি বন্দরের কাছে অবরুদ্ধ (Blockade) করার মতো অবস্থা তৈরি করা হয়।
* পাকিস্তান সেনার তৎকালীন জ্বালানি ও তেলের মজুত ছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহের।
* সমুদ্রে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজের এই তীব্র উপস্থিতি পাকিস্তানি প্রধানদের বুঝতে সাহায্য করেছিল যে, যুদ্ধ যদি পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয় তবে করাচি বন্দর অবরুদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাবে। পরবর্তীকালে নওয়াজ শরিফের স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, নৌবাহিনীর এই পদক্ষেপই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গিয়ে যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানানোর অন্যতম প্রধান কারণ।
## ৬. "মৃত্যু আসার আগেই আমি তাকে হত্যা করব": ক্যাপ্টেন মনোজ কুমার পান্ডে
১/১১ গোর্খা রাইফেলসের ক্যাপ্টেন মনোজ কুমার পান্ডে পরমবীর চক্র পান মরণোত্তর। খলুবার (Khalubar) দখলের অপারেশনে তিনি যখন যাচ্ছিলেন, চারদিক থেকে শত্রু সেনার বাঙ্কার থেকে স্নাইপার এবং ভারী গোলাবর্ষণ হচ্ছিল।
নিজের ডায়েরিতে মনোজ লিখেছিলেন:
> *"If death strikes before I prove my blood, I swear I'll kill Death!"* (আমার রক্তের যোগ্যতা প্রমাণ করার আগে যদি মৃত্যু আসে, আমি শপথ করছি, আমি মৃত্যুকেও হত্যা করব!)
খলুবার জয়ের রাতে তিনি নিজ হাতে গোর্খা খুকরি নিয়ে শত্রুর তিনটি বাঙ্কারে ঢুকে মুখোমুখি লড়াই করে শত্রুদের খতম করেন। চূড়ান্ত বাঙ্কারটি ধ্বংস করার সময় কপালে গুলি লাগা সত্ত্বেও তিনি সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে তাঁর শেষ কথাটি বলে যান—**"না ছোড়নু!"** (কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না/কাউকে বাঁচতে দেবে না!)।
## মহাবিজয়ের মহাকাব্য
২৬শে জুলাই, ১৯৯৯। সুদীর্ঘ ৮৪ দিনের কঠিন ও রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর ভারতীয় সেনা অবশেষে কারগিলের সমস্ত চুড়োয় আবারও তেরঙ্গা উন্মোচন করে ঘোষণা করে **'অপারেশন বিজয়'**-এর চূড়ান্ত সাফল্য।
এই যুদ্ধে ভারত হারায় তার **৫২৭ জন** অকুতোভয় বীর সন্তানকে, এবং আহত হন ১,৩৬৩ জনেরও বেশি সৈনিক। পাহাড়ের চূড়ায় খোদাই করা একটি স্মৃতিফলকে আজও লেখা আছে সেই অমর বাক্য:
> *"When you go home, tell them of us and say, For your tomorrow, we gave our today."*
> (তুমি যখন বাড়ি ফিরে যাবে, তাদের আমাদের কথা বোলো; আর বোলো—তোমাদের উজ্জ্বল আগামীকালের জন্য, আমরা আমাদের আজটা বলিদান দিয়ে গেলাম।)
** এমন সব অমীমাংসিত রহস্য, প্রত্নতত্ত্ব এবং আড়ালে থাকা অজানা কাহিনীগুলো নিয়ে গবেষণা করা আমার দীর্ঘদিনের শখ। আমাদের চেনা ইতিহাসের বাইরেও যে এক বিশাল রোমাঞ্চকর জগৎ লুকিয়ে আছে, সেগুলো নিয়ে আমি নিয়মিত আমার ব্লগ 'অজানা ইতিহাস খোঁজে' -এ বিস্তারিত আলোচনা করি।
https://www.ojanaitihaskhonje.com/
#কারগিল যুদ্ধ#Kargil Vijay Diwas #kargilwar #কারগিল বিজয় দিবস #indian army