#📢রাজনৈতিক আপডেট🙏
বাম আমলের যতো গুলি লোমহর্ষক খুনের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো এইটি যেখানে DC পদ মর্যাদার একজন পুলিশ অফিসার কে মেরে খালে ফেলে দিয়েছিলো।
পড়ুন আর ভাবুন বাম হার্মাদ বাহিনীর কীর্তি। আরো আছে দেবো এরপর।
১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চ | দোলপূর্ণিমার ঠিক পরের দিন | সকাল দশটা নাগাদ লালবাজার কন্ট্রোলরুমের ফোন বেজে উঠল | ফোনের ওই প্রান্তে এক অজানা লোক | সেই লোক মারফত কলকাতা পুলিশ খবর পেল খিদিরপুর বন্দর এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে | ঘটনার তাৎক্ষণিক মোকাবেলার প্রয়োজন বিচার করে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার আইপিএস বিনোদ মেহতা অতিরিক্ত পুলিশবাহিনীর অপেক্ষায় মূল্যবান সময় নষ্ট না করে গুটিকয় পুলিশকর্মীকে সঙ্গী করেই পৌঁছে গেলেন বন্দর এলাকায় | বিনোদ মেহেতার সঙ্গে ছিলেন গাড়ির চালক মোক্তার আলি। ক্রমেই যেন এক চক্রব্যূহের মতো হয়ে উঠল পুরো এলাকাটা। বিনোদ মেহেতা তো বটেই, মোক্তার আলিও বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আসলে তিনি যে দুষ্কৃতীদের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিলেন তা বুঝতে পারেননি বিনোদ মেহতা....আসলে এই ‘ট্র্যাপ’ তৈরি করা হয়েছিল সুচিন্তিত ভাবেই |
কিন্তু কেন ?
আসলে সৎ পুলিশ আধিকারিক বিনোদ মেহতা বন্দর এলাকার অপরাধীদের ‘যম’ হয়ে উঠেছিলেন। কোটি কোটি টাকার চোরাচালান রুখে বহু মাল বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করেছিলেন তিনি। ১৯৮৪ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি ওই এলাকাতেই একটি দাঙ্গার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে মারমুখী জনতাকে সামলাতে গুলি চালাতে হয় পুলিশকে। গুলিতে নিহত এক যুবকের বাবা নাকি খোলাখুলি বলেছিলেন, ”আমি অবশ্যই আমার ছেলের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব। দেখব যেন মেহতা বেশিদিন না বাঁচে।” প্রভাবশালী ওই ব্যক্তি তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের শাসক বাম জোটের মন্ত্রিসভার এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন | কেবল গার্ডেনরিচ নয়, পার্শ্ববর্তী ওয়াটগঞ্জ ও মেটিয়াবুরুজ দেখা গিয়েছিল পোস্টার। সেখানে বিনোদ মেহতাকে খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল একেবারে নাম করে। অকুতোভয় বিনোদকে টলানো যায়নি তবুও।
এর মধ্যেই এসে পড়ে ১৯৮৪ সালের দোল। দিনটা ছিল ১৯৮৪ সালের ১৭ মার্চ | সেই সময় ডাব পাড়াকে কেন্দ্র করে গার্ডেনরিচের ফতেপুর ভিলেজ রোডে দুই পক্ষের মধ্যে একটা গোলমালের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে শুনে রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন ডেপুটি পুলিশ কমিশনার আইপিএস বিনোদ মেহতা। বুঝিয়ে সুজিয়ে শান্ত করেছিলেন উত্তেজিত জনতাকে। পরিস্থিতি তখনকার মতো শান্ত হলেও পরদিন সকাল থেকে ফের অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।
১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চ | দুষ্কৃতীদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বন্দর এলাকায় পৌঁছে যান বিনোদ মেহতা |
অল্প কিছু ক্ষণের মধ্যেই হিংসাবাজ গুন্ডারা ডিসি মেহতার পুলিশবাহিনীকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে। ইতিমধ্যে তৎকালীন ডিসি (সদর), ডিসি-এসবি (প্রথম) এবং ডিসি-এসবি (দ্বিতীয়)-র নেতৃত্বে লালবাজার থেকে বিশাল পুলিশবাহিনী এসে আশ্চর্যজনক ভাবে পাহাড়পুর রোডে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। উন্মত্ত সশস্ত্র গুন্ডাদের তাড়া খেয়ে আত্মরক্ষার তাগিদে ডিসি মেহতা, তাঁর দেহরক্ষী মোক্তার আলি ধানখেতি মসজিদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন।
প্রাণ নিয়ে আর ধানখেতি মসজিদে থাকা সম্ভব নয় বুঝে ডিসি মেহতা এবং মোক্তার আলি মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসে দৌড় লাগালেন বাতিকলের দিকে। তখন তাঁদের পিছনে ছুটছে উন্মত্ত সশস্ত্র দল। বাতিকলের গলিতে ঢুকে ডিসি সাহেব ও তাঁর দেহরক্ষী আলাদা হয়ে পড়লেন।
ডিসি মেহতা প্রাণ বাঁচাতে ঢুকে পড়লেন ২২২ নম্বর বাতিকল সেকেন্ড লেনের আব্দুল লতিফ খানের বাড়িতে। লতিফ খান কলকাতা পুলিশেরই কনস্টেবল পদে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু সে সময় তিনি বাড়ীতে ছিলেন না। বাড়িতে তখন ছিলেন তাঁর বড় ছেলে হাদিস খান। মেহতা সাহেবের উর্দি দেখেই হাদিস খান বুঝে যান ইনি পুলিশের এক জন উচ্চপদস্থ অফিসার। হাদিস খান চোখের ইশারাতেই বাথরুমে ভীত-সন্ত্রস্ত ডিসি মেহতাকে আশ্রয় নিতে বললেন। কিন্তু তত ক্ষণে তাঁদের বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে রক্তের নেশায় উন্মত্ত প্রায় কুড়ি জনের বাহিনী। প্রথমে ওই বাড়িতেই একপ্রস্থ মারধর তারপর বাড়ির বাইরে এনে মাংস কাটার চপার দিয়ে কোপানো হয় বিনোদ মেহতাকে |
ময়নাতদন্তের রিপোর্টে পাওয়া গিয়েছিল ২২টা তলোয়ার আর ছুরির আঘাতের নির্মম ক্ষতচিহ্ন।
এর পর দুষ্কৃতীরা ডিসি মেহতার নিথর-উলঙ্গ দেহ ১/৫৯ ও ২০০ নম্বর আটাবাগ লেনের বাড়ির পিছনের নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। অন্য দিকে মোক্তার আলি প্রাণভয়ে আশ্রয় নিতে ঢুকে পড়েছিল জি ২২৮/৩ বাতিকল সেকেন্ড লেনের মহঃ নউমুল্লার বাড়ীতে। সেখান থেকে ঘাতক বাহিনী তাঁকে টেনে বের করে ধানখেতি ময়দানে এনে ছুরি আর তলোয়ার দিয়ে নৃশংস ভাবে খুন করল। শুধু তাই নয়, রক্তাক্ত নিথর দেহ থেকে হাত-পা কেটে নিয়ে অবশিষ্ট দেহ জ্বালিয়ে দেওয়া হল। চেনাই যাচ্ছিল না ডিসি সাহেবকে, বুকে নেমপ্লেট দেখে পুলিশ চিনতে পারে ইনি ডেপুটি পুলিশ কমিশনার বিনোদ মেহতা।
এই ঘটনায় ৪৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১৪ জনই নাবালক। যদিও বেশ কয়েকজন মুক্তিও পেয়ে যায়। শেষপর্যন্ত শাস্তি হয় আটজনের। মূল অভিযুক্ত ইদ্রিশ আলির মৃত্যু হয় পুলিশ হেফাজতে | তদন্ত ধামাচাপা দিতেই....
যে মন্ত্রীর নাম জড়িয়েছিল, তাঁর দিকে কিন্তু অভিযোগের তির ছুটে আসেনি। তিনি যতদিন বেঁচেছিলেন বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীই ছিলেন। নষ্ট করে দেওয়া হয় জরুরি নথিপত্র | বহু নথি অমিল থাকায় মামলাটির সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়নি। গোটা দুনিয়া জানতেই পারলো না কাদের ষড়যন্ত্রে সেদিন নৃশংস ভাবে খুন করা হয়েছিল অকুতোভয় এক পুলিশ আধিকারিককে....
বিনোদ মেহতার বিধবা স্ত্রী বীনা মেহতার কথায়, ”এই দগদগে ক্ষতিকে কি ভাষায় প্রকাশ করতে পারি? এ এমন এক ক্ষত যা অসাড় করে দেয় চিরকালের মতো।আসলে আমি কেবল আমার প্রিয় মানুষটিকেই তো হারাইনি। বলতে গেলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম।আমার জীবনটা যে ওকে ঘিরেই ছিল। তাই সেই দিনই আমার একটা অংশ বরাবরের মতো মারা গিয়েছিল।”
এই ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত | সে দিনের সেই নারকীয় হত্যালীলা এত দিনে ঠাঁই পেয়েছে নাগরিক সমাজের স্মৃতির সমুদ্রের গভীরতম অতলে। এই ঘটনায় মিশে গিয়েছিল মহাভারতও। অভিমন্যুর মত চক্রব্যুহে প্রবেশ করার মতো দুষ্কৃতীদের পিছু নিয়ে গার্ডেনরিচের দুর্ভেদ্য গলিতে ঢুকে পড়াই কাল হয়েছিল বিনোদের। আর বেরতে পারেননি।
একালের অভিমন্যু অকুতোভয় আইপিএস বিনোদ মেহতাকে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি....
© অহর্নিশ
তথ্য : আনন্দবাজার পত্রিকা (দেবর্ষি ভট্টাচার্য), সংবাদ প্রতিদিন (বিশ্বদীপ দে), এই সময় (মুকুল বিশ্বাস)

