
।। নর্ত্তকী ।। ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার কক্ষে প্রবেশ করিয়া রাজা দেখিলেন যে সাক্ষাৎপ্রার্থী বণিকটি তাঁহার আগমন প্রত্যাশায় দ্রুত পদচারণারত। তাঁহাকে দেখিবামাত্র উত্তেজনায় অভিবাদনের শিষ্টাচার ভুলিয়া সে বলিয়া উঠিল, “মহারাজ, উপায় হয়েছে!” মৃদু হেসে নিজ আসনে বসিয়া রাজা বলিলেন, ‘আগে সুস্থির হয়ে বসো সখা,তারপর বলো সমাচার কি?’ ইষৎ ব্যস্ত ভঙ্গিতে অভিবাদন জ্ঞাপনক্রমে আসনে বসিয়া বণিক বলিলেন,‘আমার স্মরণে এলো যে সে নৃত্যকলা নিপুণা। বিবাহপূর্ব কালে পিতৃগৃহে এই বিদ্যায় রীতিমতো শিক্ষাগ্ৰহণ করেছিল। বস্তুত এক পারিবারিক সম্মেলনে তার নৃত্য দেখেই আমি..’ রাজার সম্মুখে প্রগলভতা প্রদর্শন হইয়া যাইতেছে বুঝিয়া বণিক লজ্জিত মুখে নীরব হইলো। প্রশ্রয়ের হাসি হাসিয়া রাজা বলিলেন, ‘অতি উত্তম।কল্যাণী শুধু অসাধারণ সুন্দরীই নহেন,এমন গুণান্বিতাও তা যেনে সুখী হলেম.. কিন্তু তার সঙ্গে বর্তমান সমস্যার সমাধানের যোগ কোথায়?’উজ্জ্বলচক্ষে সওদাগর কহিলেন, “দেখুন মহারাজ,পরিবারস্থ কন্যা ও বধূকে মন্দিরে দান করার প্রথা আছে।তদুপরি সে নৃত্যপারঙ্গমা, সুতরাং দেবসেবায় তার অগ্ৰাধিকার।এখন আমি যদি নিজ স্ত্রীকে দেবদাসী হিসেবে দান করি, তবে সে আর আমার বিবাহিত পত্নী থাকেনা। অতএব কিছুকাল পরে আপনি, মন্দিরস্থ ওই রমণীকে বিধিসম্মত ভাবে বিবাহ করতে পারবেন।সমাজে এই প্রথা স্বীকৃত শুধু নয়, যথেষ্ট মর্যাদাপূর্ণ কাজ,তা তো আপনি জানেন দেব! আর আমার গৃহে প্রথমদিন তাকে দেখেই যে আপনি কতটা আকর্ষণ অনুভব করেছেন,সেই কথা তো সখাজ্ঞানে আমাকে ইতিপূর্বে জানিয়েছেন।’ আলো খেলিয়া গেল মদনাহত মহারাজের মুখমন্ডলেও। তিনি সওদাগরের হস্তধারণপূর্বক,গদগদ বাক্যে কহিলেন, “এইরূপ না হলে বন্ধু!! …রাজকীয় রন্ধনশালার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহের সমূহ দায়িত্বভার তোমার হবে,যা তোমার প্রার্থিত ছিল।আমি অবিলম্বে আদেশপত্রটিতে অনুমোদন চিহ্ন প্রদান করছি”। বণিকপত্নী হইতে দেবদাসী হইয়া রাজরানী ..এই ঘূর্ণনচক্র যাহাকে ঘিরিয়া তাহার মতামত? নারীর সম্মতি-অসম্মতির বিষয়ে কে ই বা কবে সন্ধান লইয়াছে?! —----------------------------------- নারীটির নাম নগেন্দ্রপ্রভা।রাজা হলেন কাশ্মীর অধিপতি দুর্লভক প্রতাপাদিত্য। হ্যাঁ, দেবদাসী হিসেবে মন্দিরে পরিবারের মেয়েদের দান করা এবং/এছাড়া দেবদাসীকে বিবাহ করা সমাজ স্বীকৃত ছিল। (বিজয়নগর রাজ কৃষ্ণদেবরায়ের পত্নী চেন্নাদেবী দেবদাসী ছিলেন বলে লেখর সাক্ষ্য আছে। সেই ঘটনা কিছু পরের।) কিন্তু সরাসরি একজন প্রজার পত্নীকে নিজের অন্তঃপুরবাসিনী করার রীতি সমাজে নিন্দনীয় ছিল।


