pingla Barta
ShareChat
click to see wallet page
@1449220574
1449220574
pingla Barta
@1449220574
pingla Barta Journalists Coucil of India
https://shuru.co.in/dl/FZU7BU #সাহিত্য
সাহিত্য - ShareChat
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর বিবর্তনের রূপরেখা নির্ণয় করতে গিয়ে ভাষাতাত্ত্বিকদের কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। কারণ একটা আদিম কমন ভাষা যার বিস্তার দুটো মহাদেশ জুড়ে ও যা প্রায় সবকটা ক্লাসিকাল ভাষার জননী তার শাখাপ্রশাখা ট্রেস করাটা ইস নট আ ম্যাটার অফ জোক। বহুক্ষেত্রে ভাষাগত মিল খুঁজে বের করতে গিয়ে যেমন নানান মিসিং লিঙ্ক-এ আটকে যেতে হয়েছে, তেমনই অনেকসময় কোনো একটা শব্দের বুৎপত্তি নিয়ে ভৌগোলিক সীমানাভেদে নানা মুনি নানা মতে বিস্তর জলঘোলা করেছেন। ভাষাতত্ত্ব নিয়ে পড়তে গিয়ে ‘আর্য আকাশ’ (Arya Akasha) –র পেজে সেরকমই একটা দ্বন্দের ইঙ্গিত পেলাম। সেটার কথায় আসি: ‘ব্যাকট্রিয়া–মার্জিয়ানা আর্কিওলজিকাল কমপ্লেক্স’ (BMAC) বা অক্সাস সিভিলাইজেশন নামে ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতার একটা বিস্তীর্ণ ঘাঁটি রয়েছে — মধ্য এশিয়া থেকে পশ্চিম পর্যন্ত তার সীমানা। এর মধ্যে পড়ছে উজবেকিস্তানের দক্ষিণ অংশ (উত্তর ব্যাকট্রিয়া), উত্তর আফগানিস্তানের একটা বেল্ট (দক্ষিণ ব্যাকট্রিয়া), ইস্টার্ন তুর্কমেনিস্তান ও ওয়েস্টার্ন তাজিকিস্তান। আমু দরিয়া নদীকে কেন্দ্র করে এখানকার কৃষি-নির্ভর সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। BMAC সভ্যতার ভাষা কি ছিল তা এখনো পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে ভাষাতাত্ত্বিকেরা ঠাওর করে উঠতে পারেননি, স্বাভাবিকভাবেই মতোবিরোধ রয়েছে। কেউ বলেন এখানকার ভাষাটা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর একটা লিঙ্গুইস্টিক এক্সটেনশন তো কেউ সেটাকে এক্সক্লুসিভলি নন-ইন্দো-ইউরোপিয়ান (non-IE) হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছেন। Non-IE মতাবলম্বীদের মতে এখানকার ভাষাটা ছিল ‘এলামো-দ্রাবিড়িয়ান’ বা ‘হুরো-ইউরেশিয়ান’- এর কাছাকাছি কোনো একটা ‘সাবস্ট্রেট’ ভাষা। সাবস্ট্রেট ভাষা হল এমন একটা ভাষা যা থেকে শব্দ ধার করে আরেকটা ভাষা রূপ নেয়। এক্ষেত্রে BMAC ভাষাকে IE এর সাবস্ট্রেট বলে অনেক লিঙ্গুইস্ট ভাবনা করেছেন। মাইকেল উইটজেল আর আলেক্সান্দার লুবৎস্কি এদের মধ্যে অন্যতম। তাদের মতে IE এর অন্তর্গত ভারতীয় উপমহাদেশের বৈদিক সংস্কৃত ও ইন্দো–ইরানীয় শাখাদুটোর সাবস্ট্রেট BMAC ভাষা, যার কারণে এরা মূল IE গোষ্ঠী থেকে একরকম স্বতন্ত্র। এখন সংস্কৃত ও আবেস্তান ইরানীয় যেহেতু ইটিমোলজিকালি ভীষনই রিলেটেড একে অপরের সাথে তাই এরকম ভাবনার একটা গ্রাউন্ড তৈরি হয়েছে। কিন্তু যারা IE এর পক্ষে তারা গ্রীক থেকে জার্মেনিকের সাথে সংস্কৃতের ধাতুগত মিল খুঁজে সেই থিওরি নস্যাৎ করতে চেয়েছেন, সেক্ষেত্রে সংস্কৃতের কৌলীন্য রক্ষা হয় বটে। ‘ইন্দ্র’-কেই উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক। ঋগ্বেদের ইন্দ্র, গ্রীকদের জিউস, নর্সদের থর আর লিথুয়ানিয়ান পারকুনস – একই সারির বজ্রধারী ঝড়জলের দেবতা। এদের IE লিনিয়েজ সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে BMAC থিওরিস্টদের মতে ইন্দ্র আসলে এসেছে ‘পর্জন্য’ থেকে যা নাকি আদতে এক BMAC দেবতা (পুরোটাই হাইপোথেটিকাল)। আর্যরা BMAC রিজিয়ন পার করার সময় ‘পর্জন্য’-র কনসেপ্টকে তুলে আনেন এবং ধীরে ধীরে ইন্দ্র ‘পর্জন্য’কে রিপ্লেস করে সেই স্থান দখল করে। ঋগ্বেদে ‘পর্জন্য’ ইন্দ্রের এক epithet, যার রূপ কল্পনা করা হয়েছে মেঘের দেবতা হিসাবে, ‘পর্জন্য’ মেঘের গর্জনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন, পৃথিবীকে শস্যময় করে তুলতে বৃষ্টি নামান ইত্যাদি ইত্যাদি। ওদিকে IE পন্থীরাও ইন্দ্রকে ছেড়ে দিতে নারাজ। তারা সরাসরি ভাষাগত প্রমান টেবিলে রেখে দাবী করেছেন — লিথুয়ানিয়ানে প্ল্যানেট জুপিটারকে বলা হয়েছে ‘ইন্দ্রজা’, জুপিটার (জিউস) বা জোভ আদি পিতা ‘দিউস প্টার’, যা বৈদিক সংস্কৃতের ‘দৌঃ পিতা’ অর্থাৎ আকাশ বা sky father, দৌঃ আর পৃথিবীর সন্তান ইন্দ্র — অর্থাৎ সরাসরি প্রোজেনি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। তাই লিঙ্গুইস্টদের একটা বড়ো অংশ হাইপোথেটিকাল BMAC এর থেকে IE কে এগিয়ে রেখেছেন সবসময়। বৃত্রহন্তা, সোম তথা যজ্ঞ হবির মূলভাগের অধিকারী হিসাবে ইন্দ্রের অবস্থান সেদিক থেকে স্বমহিমায় বিরাজমান। লুবৎস্কি ‘শর্ব’, शर्व শব্দটাকে BMAC বলে ক্লেম করেছেন। IE পন্থীরা Ćarwa বা অ্যাঙ্গলিসাইজড ‘Śarva’ বা ‘Zarva’ কে বৈদিক তথা ইন্দো–ইরানীয় ভাষার বুৎপত্তি-নির্ণায়ক শব্দ হিসাবেই মান্যতা দিয়ে থাকেন। ‘শর্ব’ কথার অর্থ ধনুর্ধারী, archer। এটা রুদ্র–শিবের একটা epitheth। শিব একাধারে পিনাক ধনুক এবং ত্রিপুর ধ্বংসকারী অজগব ধনু-র মালিক। शरु (শরু) থেকে शर (শর) অর্থাৎ তির এসেছে। ওদিকে সংস্কৃতে शृणाति বা ‘শৃণাতি’ শব্দের অর্থ আঘাত করার মাধ্যমে কোনোকিছু ধ্বংস করা বা demolish করা। দুটো শব্দর ধাতু একই ‘শৃ’। আচ্ছা কাউকে তির মা/রলে সে তো আহত হবে, তাই নয় কি? ‘শৃ’ থেকে যেমন ‘শর’ এসেছে তেমনই তার কাছাকাছি মিলযুক্ত প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ধাতু ‘ক্রা’ (কের > কেরা > ক্রা > কেরেউ) বা ‘ক্রেই’ থেকে এসেছে horn বা শৃঙ্গ বা শিং। শিং-এর মতো অ্যারোহেডও একটা তীক্ষ্ণভাগ যা স্কিন পেনিট্রেট করে ঢুকে যায় শিকারের শরীরে। শুক্লযজুর্বেদীয় রুদ্রাধ্যায় বা শতরুদ্রীয়তে রুদ্রের সংহার ও কল্যাণময় রূপের বর্ণনায় পাই — যোগং যোগেশ্বরং শর্বং সর্বলোকেশ্বরেশ্বরম্ । সর্বশ্রেষ্টং জগচ্ছ্রেষ্টং বরিষ্টং পরমেষ্ঠিনম্ ॥ ৭ পিনাকিনং খড্গধরং লোকানাং পতিমীশ্বরম্ । প্রপদ্য়ে শরণং দেবং শরণ্য়ং চীরবাসনম্ ॥ ৩৩ ধনুর্ধরায় দেবায় প্রিযধন্বায় ধন্বিনে । ধন্বংতরায় ধনুষে ধন্বাচার্য়ায় তে নমঃ ॥ ৩৫ আবার শিবের প্রধান অস্ত্র ত্রিশূল, তিনটে শার্প-এন্ডেড প্রঙ তীরের ফলার মতোই সুতীক্ষ্ণ। ঐতেরেয় ব্রাহ্মণে পাই রুদ্রর অস্ত্র ‘ত্রিকান্ড’ র উল্লেখ যার অর্থ করলে দাঁড়ায় a weapon with a three-parted arrowhead। ত্রিকান্ড একরকম অগ্নিময় ক্ষেপনাস্ত্র (fiery missile) যেটা রুদ্র ছুঁড়েছিলেন মৃগরূপী প্রজাপতিকে তাগ করে। এই ত্রিকান্ড-ই কি পরবর্তীতে ত্রিশূলে পরিণত হয়েছে? সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। Interesting ব্যাপার হল শিবের যেমন ত্রিশূল, তেমনই ওডিনের (নর্স) বর্শা গুঙনির, হেডিসের বাইডেন্ট (গ্রীক) বা দুই ফলাযুক্ত শূল, পোসাইডনের ত্রিশূল, দিওনিসাসের পাইন কোন-যুক্ত লাঠি থিরসাস — ব্যাপারগুলো খুব কাছাকাছি। অর্থাৎ IE গোষ্ঠীভুক্ত দেবতাদের অস্ত্র হিসাবে শর বা ঐজাতীয় ধারালো ফলাযুক্ত অস্ত্র বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। তাই মহাদেব বা রুদ্র-শিবের epithet হিসাবে ‘শর্ব’-এর BMAC হওয়া ভিত্তিহীনতাই প্রমান .
https://shuru.co.in/dl/sqXzbY #সাহিত্য
সাহিত্য - ShareChat
।। নর্ত্তকী ।। ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার কক্ষে প্রবেশ করিয়া রাজা দেখিলেন যে সাক্ষাৎপ্রার্থী বণিকটি তাঁহার আগমন প্রত্যাশায় দ্রুত পদচারণারত। তাঁহাকে দেখিবামাত্র উত্তেজনায় অভিবাদনের শিষ্টাচার ভুলিয়া সে বলিয়া উঠিল, “মহারাজ, উপায় হয়েছে!” মৃদু হেসে নিজ আসনে বসিয়া রাজা বলিলেন, ‘আগে সুস্থির হয়ে বসো সখা,তারপর বলো সমাচার কি?’ ইষৎ ব্যস্ত ভঙ্গিতে অভিবাদন জ্ঞাপনক্রমে আসনে বসিয়া বণিক বলিলেন,‘আমার স্মরণে এলো যে সে নৃত্যকলা নিপুণা। বিবাহপূর্ব কালে পিতৃগৃহে এই বিদ্যায় রীতিমতো শিক্ষাগ্ৰহণ করেছিল। বস্তুত এক পারিবারিক সম্মেলনে তার নৃত্য দেখেই আমি..’ রাজার সম্মুখে প্রগলভতা প্রদর্শন হইয়া যাইতেছে বুঝিয়া বণিক লজ্জিত মুখে নীরব হইলো। প্রশ্রয়ের হাসি হাসিয়া রাজা বলিলেন, ‘অতি উত্তম।কল্যাণী শুধু অসাধারণ সুন্দরীই নহেন,এমন গুণান্বিতাও তা যেনে সুখী হলেম.. কিন্তু তার সঙ্গে বর্তমান সমস্যার সমাধানের যোগ কোথায়?’উজ্জ্বলচক্ষে সওদাগর কহিলেন, “দেখুন মহারাজ,পরিবারস্থ কন্যা ও বধূকে মন্দিরে দান করার প্রথা আছে।তদুপরি সে নৃত্যপারঙ্গমা, সুতরাং দেবসেবায় তার অগ্ৰাধিকার।এখন আমি যদি নিজ স্ত্রীকে দেবদাসী হিসেবে দান করি, তবে সে আর আমার বিবাহিত পত্নী থাকেনা। অতএব কিছুকাল পরে আপনি, মন্দিরস্থ ওই রমণীকে বিধিসম্মত ভাবে বিবাহ করতে পারবেন।সমাজে এই প্রথা স্বীকৃত শুধু নয়, যথেষ্ট মর্যাদাপূর্ণ কাজ,তা তো আপনি জানেন দেব! আর আমার গৃহে প্রথমদিন তাকে দেখেই যে আপনি কতটা আকর্ষণ অনুভব করেছেন,সেই কথা তো সখাজ্ঞানে আমাকে ইতিপূর্বে জানিয়েছেন।’ আলো খেলিয়া গেল মদনাহত মহারাজের মুখমন্ডলেও। তিনি সওদাগরের হস্তধারণপূর্বক,গদগদ বাক্যে কহিলেন, “এইরূপ না হলে বন্ধু!! …রাজকীয় রন্ধনশালার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহের সমূহ দায়িত্বভার তোমার হবে,যা তোমার প্রার্থিত ছিল।আমি অবিলম্বে আদেশপত্রটিতে অনুমোদন চিহ্ন প্রদান করছি”। বণিকপত্নী হইতে দেবদাসী হইয়া রাজরানী ..এই ঘূর্ণনচক্র যাহাকে ঘিরিয়া তাহার মতামত? নারীর সম্মতি-অসম্মতির বিষয়ে কে ই বা কবে সন্ধান লইয়াছে?! —----------------------------------- নারীটির নাম নগেন্দ্রপ্রভা।রাজা হলেন কাশ্মীর অধিপতি দুর্লভক প্রতাপাদিত্য। হ্যাঁ, দেবদাসী হিসেবে মন্দিরে পরিবারের মেয়েদের দান করা এবং/এছাড়া দেবদাসীকে বিবাহ করা সমাজ স্বীকৃত ছিল। (বিজয়নগর রাজ কৃষ্ণদেবরায়ের পত্নী চেন্নাদেবী দেবদাসী ছিলেন বলে লেখর সাক্ষ্য আছে। সেই ঘটনা কিছু পরের।) কিন্তু সরাসরি একজন প্রজার পত্নীকে নিজের অন্তঃপুরবাসিনী করার রীতি সমাজে নিন্দনীয় ছিল।
https://shuru.co.in/dl/y2AVDy #সাহিত্য
সাহিত্য - ShareChat
কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ (জন্মঃ- . . . . ১৯০৯ - মৃত্যুঃ- ১০ মার্চ, ১৯৮০) সময়ের ঘটনা প্রবাহের অভিজ্ঞতা সিঞ্চিত তাঁর লেখায়। তাঁর রচনার সময়কাল প্রধানত চল্লিশ দশকের কলকাতা শহরে পরিশীলিত মধ্যবিত্তের জীবনযাপনের দৈনন্দিন চিত্র থেকে লব্ধ। চল্লিশ দশক নানা সঙ্কট বলয়ে নিরুদ্ধ। চল্লিশ দশক শুরুর এক বছর আগে ১৯৩৯ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঁচ ভারতবর্ষের ওপর তেমনটা না পড়লেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহ্নিশিখা ভারতবর্ষকেও স্পর্শ করেছিল। ১৯৪২-এর ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ’ভারত ছাড়’ আন্দোলন, ১৯৪৩ এ মন্বন্তর, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭-এর দেশভাগের মাঝ দিয়ে চল্লিশ দশক ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। সুবোধ ঘোষ এই বিক্ষুব্ধ দশকের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন তার লেখা গল্প ও উপন্যাসে। তার প্রকাশিত প্রথম গল্প সংকলন ’পরশুরামের কুঠার’ (১৯৪২)। সুবোধ ঘোষের লেখা গল্পে মধ্যবিত্তের পুরনো মূল্যবোধ ভেঙ্গে চৌচির করার গল্প উঠে এসেছে ’গোত্রান্তর’ গল্পে, বলতে হয় গোত্রান্তর পরিবার ভাঙ্গার গল্প। তার লেখা প্রথম দিকের গল্পে সামাজিক অসাম্য সম্বন্ধে ক্ষোভ নিচেয় পড়ে থাকা নির্যাতিত মানুষের প্রতি এক শ্রেণীর তথা কথিত প্রভাবশালী মানুষের জান্তব অবদমনকে কথাশিল্পী সুবোধ ঘোষ হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে উপস্থাপনে প্রয়াসী হয়েছেন। ’পরশুরামের কুঠার’ ছাড়া ’উচলে চড়িনু’, কিংবা ’গরল অমিয় ভেল’ ইত্যাদি গল্পে এই সব অনুষঙ্গ তিনি তুলে ধরেছেন তার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে। চল্লিশ দশকে একে একে প্রকাশ করে ছিলেন ফসিল (১৯৪৪), শুক্লাভিসার, শতভিষা (১৯৪৫), একটি নমস্কারে (১৯৪৭) প্রথম জীবনের ’বোহেমিয়ান’ সংগ্রামমুখর কঠিন থেকে আহরিত লড়াকু মানুষটি চল্লিশ দশকের ডামাডোলে নানা ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েও প্রগতি লেখক সংঘের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেননি। তিনি বিভিন্ন সময়ে নানা বিশ্বাসী হয়ে ১৯৪২-এর আগস্ট বিপ্লবে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। আগস্ট বিপ্লবে সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে তার ভাগ্যে কারাবাস জুটেছে। তিনি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হতে দ্বিধা করেননি। তার নিজের জীবন বিভিন্ন ভাবাদর্শের দোলাচলে চালিত করেছিল। একান্ত নিজস্ব ভাবনার আলোড়ন থেকে তিনি লিখেছিলেন ’কর্ণফুলীর ডাক’ এর রূপ গল্প। যে গল্পে তিনি চলমান ইতিহাসের দিকভ্রান্ত বিমূঢ়তাকে কটাক্ষ করেছিলেন নির্ভীকভাবে। সুবোধ ঘোষ ১৯৪৪ এ গড়া কংগ্রেস সাহিত্য সংঘ এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। পোড়খাওয়া জীবনের অধিকারী সুবোদ ঘোষ নানা আঙ্গিক থেকে আহরণ করেছিলেন বস্তুনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা। ১৯৪৬ এর ১৬ আগস্ট উত্তর দাঙ্গা বিধ্বস্ত নোয়াখালী থেকে তিনি গান্ধীজির সহচর থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন দাঙ্গা এবং দাঙ্গাউত্তর কালপর্বে সাম্প্রদায়িকতার হিংস্রতাকে। আর সেই সাথে দু’সম্প্রদায়ের একদল ভাল মানুষের সহমর্মিতাকেও। শুধুমাত্র গল্পকার হিসাবেই সুবোধ ঘোষ অণ্বেষু শিল্পী ছিলেন না। তিনি উপন্যাস রচনাও ঋদ্ধ তার যথার্থ প্রমাণ ’তিলাঞ্জলি’ (১৯৪৪) সুবোধ ঘোষের ঔপন্যাসিক হিসাবে প্রথম প্রভিজ্ঞার স্বাক্ষর ’তিলাঞ্জলি’। এ উপন্যাসে তিনি ’রাজনৈতিক মতাদর্শ’কে উপস্থাপনে প্রয়াসী হয়েছেন। কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মতাদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে এই উপন্যাসে। মনান্তরের পটভূমিকায় রচিত এ উপন্যাসে তৎকালীন কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ ’জাগৃতি সংঘ’র জাতীয়তা বিরোধী চরিত্রের মতবিরোধের রূপরেখা অঙ্কনে সচেষ্ট হয়েছেন তিনি এই উপন্যাসে। রাজনৈতিক ভাবাদর্শ রচিত এ উপন্যাস কতটা সার্থকতা লাভ করেছে বিচার্য বিষয়। সুবোধ ঘোষের অপর উপন্যাস ’গঙ্গোত্রী’ (১৯৪৭)ও রাজনৈতিক পটভূমিকায় রচিত। এ উপন্যাসে রাজনীতির বাইরের কথাও উঠে এসেছে। তিনি রাজনীতির প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ জীবনের অন্তরঙ্গ কথামালা তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছেন। এ উপন্যাস কতটা সার্থক তা বিচার্যের গণ্ডিতে আবদ্ধ। তিনি এক সময় কাল পুরুষ ছদ্মনামেও কিছু লেখা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি তার লেখক জীবনের শেষ পর্বে এসে দিক পরিবর্তন করেছেন যা নিঃসন্দেহে তার রচনা শৈলীর স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। শৈল্পিক গুণাবলী তার মধ্যে সতত প্রবহমান তার জ্বলন্ত প্রমাণ রোমান্টিকতায় সিঞ্চিত কাব্যিক গদ্যের উপন্যাস ’ত্রিযামা’ (১৯৫০) এবং মহাভারতের গল্প অবলম্বনে রচিত ’ভারত প্রেম কথা’র গল্পসমূহ। রোমান্টিকতায় অভিসিক্ত মহাভারতীয় প্রেম কাহিনীকে কাব্যিক ভাষায় মোহনীয় অনুষঙ্গে পৌরাণিক কাহিনীর প্রেম ভালবাসার গল্পগুলোকে আধুনিক আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন সুবোধ ঘোষ তার ’ভারত প্রেম’ কথা গল্পমালায়। ক্লাসিকধর্মী কাব্যকে আধুনিক আঙ্গিকে উপস্থাপনের নমুনা বিভিন্ন ভাষায় বিরল নয়। সুবোধ ঘোষের লেখনীতে প্রাচীন মহাকাব্য আধুনিকতায় মন্ময় হয়ে উঠেছে তার দৃষ্টান্ত দেবার পূর্বে হোমারের অডিসি কাব্য এবং টেনিসনের ইউলিসিস কবিতাটি নতুন ভাব ভাষা আর ছন্দময়তায় তারা আধুনিক মনের উপযোগী করে তুলেছেন, যা আমরা সুবোধ ঘোষের ’ভারত প্রেম কথা’তে দেখতে পাই। প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারতের নরনারীর প্রেম কাহিনীর মূল কথা থেকে বিচ্যুত না হয়ে সম্প�র্ণ স্বাতন্ত্রবোধ উজ্জীবিত করেছেন ’ভারত প্রেম কথা’র গল্পগুলো তা নিঃসন্দেহে অনবদ্য। সুবোধ ঘোষের মনীষার প্রমাণ রেখেছেন প্রাচীন মহাভারতীয় প্রেম কাহিনীতে আধুনিকায়ন করে। সুবোধ ঘোষ তার ’ভারত প্রেম কথা’র নতুন করে পাব বলে শীর্ষক মুখবন্ধে ’নরনারীর প্রণয় ও অনুরাগ, দাম্পত্যের বন্ধন বাৎসল্য সখ্য-শ্রদ্ধা ভক্তি ক্ষমা আত্মত্যাগ ইত্যাদি যে সব সংস্কারের উপর সামাজিক কল্যাণ ও সৌষ্ঠব নায়ক নায়িকার জীবনে সমস্যার ভিতর দিয়ে বর্ণিত হয়েছে। শত ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের যেসব কাহিনী মহাভারতে বিবৃত হয়েছে তার মধ্যে এই বিংশ শতাব্দীর যে কোন মানুষ তার জীবনের এ সমস্যার অথবা আগ্রহের রূপ দেখতে পাবেন। এ কারণে শতেক যুগের কবি দল মহাভারত থেকে তাদের রচনার আখ্যান বস্তু আহরণ করেছেন।’ প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, রবীন্দ্রনাথও মহাভারতের কাহিনীকে তার বিভিন্ন কবিতা কাব্যে ব্যবহার করেছেন। ’কচ ও দেবযানী’ সংবরণ তপতী কাহিনী এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুবোধ ঘোষের ’ভারত প্রেম কথা’ বাংলা গল্প সাহিত্যে তার মাস্টার পিস বললে অত্যুক্তি হয় না। তিনি শুধুমাত্র এ পর্যন্ত লিখেই ক্ষান্ত হননি। তিনি তার নিজস্ব ঘরানায় মানভূম জেলা অন্ত্যবাসী জীবনের গাথা ’শতকিয়া’ (১৯৫৮)তে উপস্থাপন করেছেন আর এক উপাখ্যান। জন্ম সুবোধ ঘোষ বিহারের হাজারিবাগে জন্মগ্রহণ করেন। আদি নিবাস ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বহর গ্রামে। হাজারিবাগের সেন্ট কলম্বাস কলেজের ছাত্র ছিলেন। বিশিষ্ট দার্শনিক ও গবেষক মহেশ ঘোষের লাইব্রেরীতে পড়াশোনা করতেন। প্রত্নতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব, এমনকি সামরিক বিদ্যায়ও তাঁর যথেষ্ট দক্ষতা ছিল । তার লেখালেখির কালপর্ব ১৯৪০ থেকে ১৯৮০। তার প্রথম মুদ্রিত রচনা সম্বন্ধে সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও যেটুকু জানা যায় তা হচ্ছে সুবোধ ঘোষের লেখা প্রথম ছোট গল্প অযান্ত্রিক, যা আনন্দবাজারের বার্ষিক দোল সংখ্যায় (১৯৪০) ছাপা হয়। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সুবোধ ঘোষের আগমন বলতে গেলে অভাবনীয় রূপে। সাধারণ একটা পরিবার থেকে উঠে আসা সুবোধ নিজেকে বাংলা সাহিত্যের আসরে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন ভাগ্যক্রমেই বলতে হয়। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করে হাজারিবাগ সেন্ট কলম্বাস কলেজে ভর্তি হয়েও অভাব অনটনের জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে জীবন জীবিকার তাগিদে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় তাকে। হেন কাজ নেই তাকে করতে হয়নি সংসারের ঘানি টানার প্রয়োজনে। পড়াশোনা ছেড়ে কলেরা মহামারি আকার নিলে বস্তিতে টিকা দেবার কাজ নেন। বিহারের আদিবাসী অঞ্চলে বাসের কন্ডাক্টর, সার্কাসের ক্লাউন, বোম্বাই পৌরসভার চতুর্থ শ্রেণীর কাজ, চায়ের ব্যবসা, বেকারির ব্যবসা, মালগুদামের স্টোর কিপার ইত্যাদি কাজে তিনি তার প্রথম জীবনের যতটা অংশ ব্যয় করেন। বিভিন্ন লেখকের স্মৃতি কথা থেকে তার পোড় খাওয়া জীবনের সংগ্রাম করে গ্রাসাচ্ছাদনের কথা যতটুকু জানতে পারা যায় তা থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না একজন প্রতিভাধরের প্রথম জীবনের প্রতিভা বিকাশের দ্বার রুদ্ধ হয়েছিল। জীবন সংগ্রামী সুবোধ ঘোষ অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বিশ শতকের তিনের দশকে কলকাতায় এসে থিতু হবার চেষ্টা করেন। প্রথমে শ্রী গৌরাঙ্গ প্রেসে প্রুফ দেখার কাজ পান। এক সময় ওখানে ম্যানেজারের দায়িত্বও পান। সুবোধ ঘোষ কলকাতায় এসে এটা ওটা কাজের মাঝে গল্প লিখতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় দফতরে কাজ পেলেন। আর এখান থেকেই তার সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ। ১৯৪০ সালে সুরেশ মজুমদারের (১৮৮৮-১৯৫৪) ইচ্ছায় আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে যোগদানই তার লেখক পথ সুগম করে দেয়। একটানা চল্লিশ বছর আনন্দবাজার পত্রিকাতেই কাজ করেছেন, আনন্দ বাজার পত্রিকায় তার কাজ ছিল বহুমুখী। প্রতিবেদক, কলাম লেখকের সাথে সাথে প্রধানত তিনি সম্পাদকীয় লেখার কাজটাই বেশি করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগদানের প্রথম কালপর্বে সুবোধ ঘোষ সৃজনশীল গল্প ও প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন এটা সুনিশ্চিত। সুবোধ ঘোষের প্রথম মুদ্রিত রচনা কোনটি তা নিশ্চিতভাবে জানা গবেষণা লব্ধ ব্যাপার। তবে যতদূর তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় তা থেকে প্রতীয়মান হয় তার প্রথম মুদ্রিত ছোটগল্প অযান্ত্রিক যা আনন্দবাজারের বার্ষিক দোল সংখ্যায় (১৯৪০) প্রকাশিত হয়। যে কথা আগেই বলা হয়েছে। অনামী সঙ্ঘ (বা চক্র) নামে তরুণ সাহিত্যিকদের বৈঠকে বন্ধুদের অনুরোধে সুবোধ ঘোষ পর পর দুটি গল্প অযান্ত্রিক এবং ফসিল লেখেন যা বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। গল্প লেখার ইতিবৃত্ত সম্বন্ধে স্বয়ং সুবোধ ঘোষ কী বলেন তা এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। ’- সন্ধ্যা বেলাতে বৈঠক, আমি দুপুর বেলাতে অর্থাৎ বিকেল হবার আগেই মরিয়া হয়ে সাততাড়াতাড়ি গল্প দুটি লিখে ফেলেছিলাম। আশা ছিল, এইবার অনামীদের কেউ আর আমার সম্পর্কে রীতি ভঙ্গের অভিযোগ আনতে পারবেন না। কিন্তু একটুও আশা করিনি যে বন্ধু অনামীরা আমার লেখা ওই দুই গল্প শুনে প্রীত হতে পারেন। অনামী বন্ধুদের আন্তরিক আনন্দের প্রকাশ ও উৎসাহবাণী আমার সাহিত্যিক কৃতার্থতার প্রথম মাঙ্গলিক ধান দূর্বা।’ যতদূর জানা যায় চিন্ময় সেহানবীশ প্রবর্তিত ’অগ্রণী’ পত্রিকায় তার ফসিল গল্প প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। গত শতকের চার দশকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সুবোধ ঘোষের ফসিল গল্প চমক সৃষ্টি করে। অনামী সঙ্ঘের বন্ধুদের অনুরোধে সুবোধ ঘোষ গল্প দুটি প্রথমে লিখলেও তার ভিত যে অনেক আগেই রচিত হয়েছিল তা বুঝতে কষ্ট হয় না অযান্ত্রিক ও ফসিল গল্প দুটি বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিয়ে পাঠ করলে। সুবোধ ঘোষ তার জীবনের দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন বিহারের রাচি, হাজারিবাগ প্রভৃতি অঞ্চলে। তার বাল্য, কৈশোর ও যৌবনের নানা অভিজ্ঞতা বাংলার বাইরের বিহারকেন্দ্রিক অঞ্চলের নানা স্থান ও কাজের মধ্য থেকে আহরিত। আর একারণেই তার অযান্ত্রিক, ফসিলসহ নানা গল্প উপন্যাসের পটভূমি ওই অঞ্চলকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতালব্ধ হওয়া অস্বাভাবিক নয় মোটেই। সুবোধ ঘোষ তার বিখ্যাত ফসিল গল্পের বিষয়েই শুধু চমক সৃষ্টি করেননি, শুধু গল্পের গঠন নৈপুণ্যই প্রদর্শন করে ক্ষান্ত হননি, তিনি তার শিল্প জীবনের দর্শনকে অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। তার গল্পে তিনিও জীবন অভিজ্ঞতার ফসল তুলে ধরেছেন শৈল্পিক রুচি ও মেজাজে। তিনি গল্পের গদ্যে কাব্য স্পন্দিত হিল্লোলিত ভাষা ও ভঙ্গি প্রয়োগে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছেন সাবলীল রীতিতে। প্রসঙ্গক্রমে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সুবোধ ঘোষের ফসিল ও অযান্ত্রিক গল্পের ওপর আলোকপাত করা যেতে পারে। অযান্ত্রিক ও ফসিল গল্পের বিষয়বস্তু সম্প�র্ণ ভিন্ন। অযান্ত্রিককে সুবোধ ঘোষ প্রাণহীন লক্কড় ঝক্কড় মার্কা একখানা গাড়িকে নিয়ে একটা নিটোল গল্প ফেঁদে বসেছেন যার সাহিত্য মূল্য নিঃসন্দেহে অসাধারণ। শুধু মানুষ ভাঙ্গাচোরা একটা ট্যাক্সি নিয়ে ট্যাক্সি মালিক বিমলের ভাগ্য আবর্তিত হবার কাহিনী অনন্যসাধারণ বাস্তবতার নিরিখে গল্পের আকারে তুলে ধরেছেন বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী গল্পকার সুবোধ ঘোষ। অন্যদিকে তার লেখা ফসিল অন্য আঙ্গিকের গল্প, যার মধ্যে ত্রিশ চল্লিশ দশকের আগ্রাসী মানুষের আগ্রাসন নির্যাতনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, নির্যাতিত মানুষের মুক্তির আকাঙখা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তুলেছিল। যে সময় ব্রিটিশ ভারত বর্ষে নানামুখী মতবাদের টানাপোড়েন মানুষের মন প্রাণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে দোলায় মান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে গান্ধীর অহিংস আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লবীদের সহিংস সংগ্রাম, মার্কসীয় সাম্যবাদীদের আলোড়নে সব একাকার হয়ে ওঠে। ফসিল গল্প প্রকাশিত হলে সুবোধ ঘোষ সম্বন্ধে বলা হয়েছিল তিনি সাম্যবাদী আদর্শের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এ গল্প লিখেছেন। আসলে সুবোধ ঘোষের লেখায় ’মতবাদ’ কিছু যদি থাকে প্রকৃতপক্ষে তা ছিল তার নিজস্ব আবিষ্কারের ফসল। তার চিন্তার আর একটি একান্ত নিজস্ব গল্পের ফসল অযান্ত্রিক মেনে নিতেই হবে। সুবোধ ঘোষের ফসিল গল্প বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টি করলো সেকথা আগেই বলা হয়েছে। ফসিল গল্প সম্বন্ধে আরো কিছু বিষয়ের অবতারণা করা যেতে পারে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন ঘটনা প্রবাহের একটা অনুষঙ্গ এ গল্পে উঠে এসেছে। অনামী সঙ্ঘের বৈঠকে ফসিল গল্পটা পড়া হয়। সেই বৈঠকে অরুণ মিত্র, বিনয় ঘোষ, বিজন ভট্টাচার্য, স্বর্ণ কমল ভট্টাচার্য, গোপাল হালদার, সজেন্দ্র নাথ মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, হীরেন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ফসিল গল্পের গল্পকার সুবোধ ঘোষের সাথে প্রগতিবাদী বুদ্ধিজীবীদের বিচ্ছেদ ঘটে এক পর্যায়ে তার নিজস্ব মতাদর্শের কারণে। সুবোধ ঘোষ ফসিল গল্পে কোন আদর্শ ও মতবাদকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন তা অতি সংক্ষেপে দেয়া যেতে পারে। লোকজন ফসিল গল্পের পটভূমিকা বিহারের আদিবাসী অঞ্চল এবং সেই অঞ্চলের অধিবাসী। বাংলা মুলুকের বাইরে বিহারের অঞ্জনগড়ের আদিবাসীদের পাশের অভ্র খনির অচেনা লোকের কাহিনী সুবোধ ঘোষ তার এ গল্পের নিজস্ব আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে। বাঙালি লেখকদের লেখনীতে বিহার অঞ্চলের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে তার মধ্যে রোমান্স আনন্দ বেদনার সাথে স্বপ্নের বিভোরতা অবশ্যই ছিল, বিহার অঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশও তাদের গল্পে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু কালজয়ী গল্পকার সুবোধ ঘোষের গল্পের ঘরানা নিঃসন্দেহে অন্য ধরনের ধাঁচের লেখা। গল্প কথা গাঁথুনিতে স্থানিক পরিবেশের শ্বোসরোধকারী আবহ যার মাঝে জমাট বাধা সংঘাত সংঘর্ষের সাবলীল উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মানুষ কি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ফসিলে পরিণত হয় তারই গল্প শুনিয়েছেন সুবোধ ঘোষ তার ফসিল গল্পে। দেশীয় রাজা মহারাজা পরদেশী সওদাগর দানবীয় সন্ত্রাস করে নিছক দুলাল মাহাজের মৃতদেহ নিক্ষেপ করে খনি গহ্বরে। মহাজনদের অন্যায় অত্যাচারের বলি হয়ে একসময় ফসিল হবার অপেক্ষায় থাকে। অণ্বেষু কথাশিল্পী সুবোধ ঘোষের লেখনী সাহসী কল্পনায় ভর করে দুর্গত শ্রমিক স্বজনদের দলিত দেহস্তপের মাঝখান থেকে ফসিল তুলে এনেছেন। সুবোধ ঘোষের গল্প সৃজনের ব্যতিক্রমী প্রয়াস লক্ষণীয়ভাবে উঠে এসেছে তার অযান্ত্রিক গল্পে। ভাঙ্গা মোটর গাড়ির সাথে মানুষের প্রগাঢ় মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে উজ্জ্বল সাক্ষরতার লেখা অযান্ত্রিক গল্প। বিমলের ভাঙা গাড়ির নাম জগদ্দল। লেখক এই গল্পে বলেছেন বিমলের সাথে এই গাড়ির সম্পর্কের কথা।- ব্যস্তত্রস্ত কর্মজীবনে সুদীর্ঘ পনেরোটি বছরের সাথী। এই যন্ত্রপন্ডটি বিমলের সেবক বন্ধু আর সুবোধ ঘোষের মতো শিল্পী নির্মাণ একটা ভাঙ্গা গাড়ির মাঝে প্রাণসঞ্চার করতে সচেষ্ট হয়েছেন। গল্পকার বিমলের মুখ দিয়ে কী বলিয়েছেন তা দেখা যেতে পারে। বিমল ভাবে আমিও যন্ত্র। বেঙ্গলী ক্লাব বলেছে ভাল। বিমল খুশি হয়ে মনে মনে হাসে। কিন্তু জগদ্দলও যে মানুষের মতো বেঙ্গলী ক্লাব তা বোঝে না। এইটেই দুঃখ। মানুষ যন্ত্র, যন্ত্র মানুষ-মানুষ যন্ত্রে এই ওতপ্রোত একান্ত বোধ শিল্পীর অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতাজাত প্রতীতি; অযান্ত্রিক গল্পে সুবোধ ঘোষ যে দুঃসাহস দেখিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। বিমল যে গাড়িকে প্রাণাধিক ভালবাসে তার শেষ পরিণতি চরম বিয়োগান্তক ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। আমরা সুবোধ ঘোষের অযান্ত্রিক গল্পে যে অসাধারণ মেধা, মনন আর চিন্তার একটা জড় বিষয়কে যেন প্রাণদান করে জীবন্ত করে তুলেছে তার দৃষ্টান্ত পাঠকের সামনে হাজির করার উদ্দেশ্যে এই গল্পের প্রথম এবং শেষ কিছুটা উদ্ধৃতি করা যেতে পারে। গল্পের শুরুটা এভাবে- ’বিমলের একগুঁয়েমি যেমন অজয়, তেমনি অক্ষয় তার এই ট্যাক্সিটার পরমায়ু। সাবেক আমলের একটা ফোর্ড, প্রাগৈতিহাসিক গঠন, সর্বাঙ্গে একটা কদর্য-দীনতার ছাপ। যে নেহাত দায়ে পড়েছে বা জীবনে মোটর দেখেনি, সে ছাড়া আর কেউ ভুলেও বিমলের ট্যাক্সির ছায়া মাড়ায় না। গৃহপালিত পশুর সঙ্গে মানুষের প্রীতির সম্পর্ক গল্পে উপস্থাপন করেছিলেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, বনফুল প্রমুখ। একমাত্র সুবোধ ঘোষই অযান্ত্রিক গল্পে দেখিয়েছে বিমলের কাছে যে যন্ত্র ছিল অন্নদাতা, যাকে হারানোর বেদনা বিমলকে যথার্থই মর্মবেদনার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল। সম্মাননা আনন্দ পুরস্কার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিনী পদক ভারত প্রেমকথা - সুবোধ ঘোষ। একসময় সুবোধ ঘোষের 'ভারত প্রেমকথা' বিক্রির রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল, সেই বেস্ট সেলার বইটির বিক্রির সংখ্যা ছিল ৬০ হাজারের মতো। তাঁর একটি প্রখ্যাত ছোটগল্প 'জতুগৃহ'। ছোটগল্পটি অবলম্বনে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তপন সিংহ ঐ নামে এবং বোম্বেতে হিন্দীতে একটি ছবি নির্মিত হয় 'ইজাজাত' নামে যার পরিচালনায় ছিলান গুলজার।
https://shuru.co.in/dl/aXuRc2 #সাহিত্য
সাহিত্য - ShareChat
শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং সাহিত্যিক মদনমোহন তর্কালঙ্কার (জন্মঃ- ৩ জানুয়ারি, ১৮১৭ – মৃত্যুঃ- ৯ মার্চ, ১৮৫৮) মদনমোহন চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন নদিয়ার নাকাশিপাড়ার বিল্বগ্রামে। বাবা রামধন চট্টোপাধ্যায় এবং মা বিশ্বেশ্বরী দেবী। সংস্কৃত কলেজের লিপিকর বাবা ‘বিদ্যারত্ন’ উপাধি পেয়েছিলেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মদনমোহন ছিলেন সবার বড়। ১৮২৯ সালে সংস্কৃত কলেজে পড়তে গিয়ে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। ইয়ং বেঙ্গলের প্রতিষ্ঠাতা ডিরোজিওর উদ্যোগে সে সময়ে দেশ জুড়ে চলছে কুসংস্কার, নানা সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে ও ইংরেজি স্ত্রী শিক্ষার প্রসারের জন্য আন্দোলন। ইয়ংবেঙ্গলের অন্যতম সদস্য রামতনু লাহিড়ীর বাড়িতে থাকার সুবাদে মদনমোহনও সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারপর থেকে ১৮৫৮ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মদনমোহন শিক্ষা এবং সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত থাকেন। ১৮৪২ সালে হিন্দু কলেজের পাঠশালার প্রধান শিক্ষক হিসাবে মদনমোহন কর্মজীবন শুরু করেন। তারপর ১৮৪৬ সালে নদিয়ার রাজা শ্রীশচন্দ্র কৃষ্ণনগরে কলেজ স্থাপন করলে তিনি সেখানে কিছুদিন অধ্যাপনা করেন। ১৮৪৬ থেকে ১৮৫০ পর্যন্ত তিনি সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৮৫০-৫৪ পর্যন্ত তিনি ছিলেন মুর্শিদাবাদের জজ পণ্ডিত। বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজ নির্মাণেও তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। জীবনের শেষ পর্বে প্রশাসক হিসেবেও তিনি বেশ কিছু সংস্কারে হাত দেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মুর্শিদাবাদ এবং কান্দিতে দাতব্য চিকিৎসালয়, মেয়েদের স্কুল, রাস্তাঘাট নির্মাণ করেন। সেকালে শিক্ষা সংস্কারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১৮৪৯ সালে বেথুন সাহেব যখন এদেশের মেয়েদের জন্য ‘ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল’ স্থাপনে মদননোহন ছিলেন তাঁর প্রধান সহযোগী। বিনা বেতনে তিনি ওই স্কুলে পড়াতেন। শুধু তাই নয় তিনি তাঁর দুই মেয়ে ভুবনমালা এবং কুন্দমালাকে ওই স্কুলে ভর্তি করেন। শিশুদের জন্য লেখেন ‘শিশু শিক্ষা’ নামে একটি বই। যে বই দিয়ে শৈশবে রবীন্দ্রনাথের লেখাপড়া শুরু হয়েছিল। রবিজীবনীতে তার উল্লেখ পাওয়া যায়। “রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা আরম্ভ হয়েছিল মদনমোহনকৃত শিশুশিক্ষা দিয়ে এবং তারপরে সম্ভবত বর্ণপরিচয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেছিল।” ১৮৪৯ সালে লেখা শিশুশিক্ষার দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ভাগ ১৮৫০ এর মধ্যে তাঁর লেখা হয়ে গিয়েছিল। বলা হয় বইটি ছিল বাঙলার প্রথম “প্রাইমার”। এর ঠিক পরেই তিনি লেখেন ‘স্ত্রীশিক্ষা’ নামে এর একটি বই। যেখানে তিনিই প্রথম বলেছিলেন শিশুকে শিক্ষিত করতে গেলে মায়েরই শিক্ষা আগে দরকার। সমাজ সংস্কারক তিনি ছিলেন 'হিন্দু বিধবা বিবাহ' প্রথার অন্যতম উদ্যোক্তা। এই সম্পর্কে বহরমপুর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মৃণালকান্তি চক্রবর্তী বলেন, “১৮৫৭ সালে প্রথম বিধবা বিবাহ হয়। ওই বিয়ের পাত্র শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এবং পাত্রী ছিলেন কালীমতি। তাঁদের দুজনের সন্ধান ও যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে মদনমোহন তর্কালঙ্কার ছিলেন অন্যতম।” প্রনীত গ্রন্থাবলী মদনমোহন বিদ্যাসাগরের সহযোগিতায় ‘সংস্কৃত-যন্ত্র’ (১৮৪৭) নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকে ভারতচন্দ্রের  অন্নদামঙ্গল কাব্যটি সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয়। বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় সহযোগিতা দান করেন। শুধু তাই নয়, নিজ কন্যা ভুবনমালা ও কুন্দমালাকে তিনি  ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হিন্দু ফিমেল স্কুলে (১৮৪৯) প্রেরণ করেন এবং নিজে বিনা বেতনে ওই স্কুলে বালিকাদের পাঠদান করতেন। ওই সময় ভারতে মেয়েদের প্রকাশ্যে শিক্ষার সুযোগ ছিল না; সমাজ তা ভাল চোখে দেখতও না। মদনমোহন নিজেও মুর্শিদাবাদ ও কান্দিতে বালিকা বিদ্যালয়, ইংরেজি বিদ্যালয়, অনাথ আশ্রম, দাতব্য চিকিৎসালয় ইত্যাদি জনহিতকর প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। স্ত্রীশিক্ষার সমর্থনে তিনি সর্বশুভকরী পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় (১৮৫০) দৃষ্টান্তস্থাপনকারী একটি প্রবন্ধ রচনা করেন। রসতরঙ্গিণী (১৮৩৪) ও বাসবদত্তা (১৮৩৬) মদনমোহনের মৌলিক কাব্যগ্রন্থ। তিন খন্ডে প্রকাশিত তাঁর শিশু শিক্ষা (১৮৪৯ ও ১৮৫৩) শিশুদের উপযোগী একটি অনন্যসাধারণ গ্রন্থ; ‘পাখী সব করে রব রাতি পোহাইল’ শিশুপাঠ্য এই বিখ্যাত কবিতাটি তাঁরই রচনা। মদনমোহন  সংস্কৃত ভাষায় রচিত বেশ কয়েকখানি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। সেগুলির মধ্যে সংবাদতত্ত্বকৌমুদী, চিন্তামণিদীধিতি, বেদান্তপরিভাষা, কাদম্বরী, কুমারসম্ভব ও মেঘদূত প্রধান। কবি-প্রতিভার জন্য  সংস্কৃত কলেজ থেকে তিনি ‘কাব্যরত্নাকর’ এবং পান্ডিত্যের জন্য ‘তর্কালঙ্কার’ উপাধি লাভ করেন। মদনমোহন তর্কালঙ্কার বাংলা ভাষায় শিক্ষা বিস্তারের জন্য যথেষ্ট শ্রম ব্যয় করেন; তাঁর রচিত শিশুশিক্ষা গ্রন্থটি ঈশ্বরচন্দ্র কর্তৃক রচিত "বর্ণপরিচয়" গ্রন্থটিরও পূর্বে প্রকাশিত। তিনি 'শিশুশিক্ষা' পুস্তকটির 'প্রথম ভাগ' ১৮৪৯ সালে এবং 'দ্বিতীয় ভাগে' ১৮৫০ সালে প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে পুস্তকটির 'তৃতীয় ভাগ' এবং 'বোধোদয়' শিরোনামে 'চতুর্থ ভাগ' প্রকাশিত হয়। 'বাসব দত্তা' তাঁর আরেকটি গ্রন্থ। তাঁর বিখ্যাত কিছু পংক্তির মধ্যে রয়েছে: ‘পাখী সব করে রব, রাতি পোহাইল’;  ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, ; সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’; ‘লেখাপড়া করে যে/ গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’ তিনি ১৪টি সংস্কৃত বই সম্পাদনা করেন। মৃত্যু কান্দিতে কলেরা রোগে ভুগে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। আমার পণ মদনমোহন তর্কালঙ্কার সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে। ভাইবোন সকলেরে যেন ভালোবাসি, এক সাথে থাকি যেন সবে মিলেমিশি। ভালো ছেলেদের সাথে মিশে করি খেলা, পাঠের সময় যেন নাহি করি হেলা। সুখী যেন নাহি হই আর কারো দুখে, মিছে কথা কভু যেন নাহি আসে মুখে। সাবধানে যেন লোভ সামলিয়ে থাকি, কিছুতে কাহারে যেন নাহি দিঈ ফাঁকি। ঝগড়া না করি যেন কভু কারো সনে, সকালে উঠিয়া এই বলি মনে মনে। পাখি-সব করে রব মদনমোহন তর্কালঙ্কার পাখী-সব করে রব, রাতি পোহাইল। কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল।। রাখাল গরুর পাল, ল'য়ে যায় মাঠে। শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।। ফুটিল মালতী ফুল, সৌরভ ছুটিল। পরিমল লোভে অলি, আসিয়া জুটিল।। গগনে উঠিল রবি, লোহিত বরণ। আলোক পাইয়া লোক, পুলকিত মন।। শীতল বাতাস বয়, জুড়ায় শরীর। পাতায় পাতায় পড়ে, নিশির শিশির।। উঠ শিশু মুখ ধোও, পর নিজ বেশ। আপন পাঠেতে মন, করহ নিবেশ।।
https://shuru.co.in/dl/TsZ3Do #সাহিত্য
সাহিত্য - ShareChat
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ৮ মার্চ নারী - কবি নজরুল : সাম্যের গান গাই-/ আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই! / বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।/ বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,/ অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।/ নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?/ তারে বলো, আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান। / অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,/ ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।/ এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,/ নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল। তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছে যত ফল, অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান। জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী, সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি’। পুরুষ এনেছে যামিনী-শানি-, সমীরণ, বারিবাহ! দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশীতে হ’য়েছে বধূ, পুরুষ এসেছে মরুতৃষা ল’য়ে, নারী যোগায়েছে মধু। শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হল, নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল। নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে’ ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে। ...................... আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ প্রতি বৎসর ৮ই মার্চ পালিত হয়, ১৯৭৭এ রাষ্টসঙ্ঘের আহ্বান অনুযায়ী। রাষ্ট্রসঙ্ঘের ঘোষণার অনেক আগে থেকেই ‘জাতীয় নারী দিবস’ পালিত হয়ে আসছে বিভিন্ন দেশে। প্রথমে বলা হ’ত ‘আন্তর্জাতিক কর্মরত নারী দিবস বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং উইমেনস ডে’। বিশ্বে প্রথম ‘জাতীয় নারী দিবস’ পালিত হয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ১৯০৯ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি , আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক পার্টির উদ্যোগে। ১৯১০এর আগষ্ট মাসে কোপেনহেগেন শহরে সমাজতান্ত্রিক পার্টিগুলির ২য় আন্তর্জাতিকে জার্মানীর সমাজতান্ত্রিক পার্টি প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রস্তাব করে। সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্বের ১৭টি দেশের ১০০জন প্রতিনিধি, নারীর সমানাধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার হন। পরের বছর ১৮ই মার্চ অষ্ট্রিয়া, জার্মানী, হাঙ্গেরি, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশে দশ লক্ষাধিক মানুষ ঐদিন ‘নারীর সমানাধিকার’, ‘চাকুরীতে লিঙ্গভেদের অবসান’ এবং অন্যান্য দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে যথারীতি ফেব্রুয়ারির শেষদিনে ‘নারী দিবস’ পালিত হতে থাকে ১৯০৯ সাল থেকেই। বিপ্লব-পূর্ব রাশিয়ায় প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালিত হয় ১৯১৩তে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম রবিবার লেনিন বলেছিলেন ‘নারী জাতি শৃঙ্খলিত হয়েছে সবচেয়ে আগে, তার শৃঙ্খল মুক্তি ঘটবে সবচেয়ে শেষে’। রুশ বিপ্লবের প্রাক্কালে ১৯১৭’র ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবার সেন্টস পিটসবার্গে মহিলাদের যে প্রতিবাদ সমাবেশ হয় নানান দাবিতে, তা ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মর্যাদা পেয়েছিল। জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে সেই দিনটি ছিল ৮ই মার্চ। ১৯১৭’র পর থেকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে ৮ই মার্চ দিনটি ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ রূপে পালিত হতে শুরু করে। অবশেষে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৭৭এ আহ্বান জানান, প্রতি বৎসর ৮ই মার্চ দিনটিকে নারীজাতীর স্বাধিকার রক্ষার দিন হিসাবে পালন করার। সেই থেকে এদেশেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের রেওয়াজ শুরু হয়েছে। ( তথ্য সংগৃহীত) ................................ আমি নারী মৌ দাশগুপ্তা আমি নারী আমি পারি শুধু সৃষ্টিই নয় জানি ধ্বংস আমি যে মহাশক্তির অংশ ! আমি পারি প্রেমে বাঁধতে , পারি ভবিষ্যৎকে মুঠোয় ধরতে। হতে পারি ক্ষুদ্র কিন্তু উচ্চ আমার আশা, আমি স্বাধীন, আমি মুক্ত তাই আকাশে ভাসা। আমি জায়া, আমি মায়া, আমি শান্ত, ধীর-স্থির, আমি সুশীতল, আমি দেবীর প্রতীমা অবিকল , স্নেহ দেই, সেবা দেই, দেই বিশ্বস্ত সঙ্গ, ষোল কলাতেও পটু আমি, জানি হরেক তামাশা রঙ্গ। ভেবোনা অবলা অসহায় আমি কোরনা আমায় হেয় আমি কর্ত্রী আমি নেত্রী, আমিই উদ্দেশ্য এবং বিধেয়। আমি রমা আমি ক্ষমা লজ্জা পেতে পারি আমি আমি লজ্জাবতী লতা, হাসতে পারি, লুকিয়ে রেখে যত মনের ব্যথা। শাসন করতে পারি আমি , কথাও জানি কটু, প্রতিশোধটা নিতেও পারি, তাতেও আমি পটু। ত্যাগ আমার শক্তি, আবার ছিনিয়ে নিতেও পারি, দয়িতের সাথে এই ধরণীতে সুখের স্বর্গ গড়ি। আমি স্ত্রী, আমি সৃষ্টি , আমি পুরুষের পৃথিবীকে গড়ি, নানা রূপে নানা পরিচয়ে, পরম পুরুষের প্রকৃতি আমি, গরবিনী আমি নারী হয়ে। আমি পুরুষের অহং বোধ, আমি পুরুষের প্রেরণা , সহকর্মিনী, সহধর্মিনী ভাগ করে নিই দুঃখ যাতনা , পুরুষ করেছে নারীকে ভ্রষ্টা, দিয়েছে দেবীর মহিমা, আমি সৃষ্টি সুখের উৎস, আমিই স্রষ্টা , আমি যে মা। ................................. সোনামণি আ ফ রো জা অ দি তি সোনামণি, কিশোরী এক মেয়ে- বাবা গেছে তার সিডর ঝড়ে থাকে ফুটপাতে মায়ের সাথে মা তার কুড়ায় কাগজ কখনও ভাঙে ইট , পারে না জুটাতে মায়ের ইট ভাঙা হাতে দু’বেলা, দু’মুঠো সালুন ভাত মায়ের কষ্টে, চোখের জলে ভাসে মেয়ে বলে, মা, মাগো, তোর কষ্ট সয় না মা, ওই যে উঁচু উঁচু দালান, দে না কারও বাড়ি কাজ করি, নে সাথে ভাঙি ইট, কুড়াই কাগজ। ক্যাবল খিদা লাগে গো মা, ক্যান খিদা লাগে মা , কতোদিন খাই নি গো মা , ভরপেট তিনবেলা। মেয়ের কথায় ভয় ঢোকে মায়ের বুকে, ডাগর মাইয়া নজর দেয় যদি কেউ, ভয় পায় মা। কয়, না, রে মা, না সা’ব গো বাড়ি! না, মা, কতো কী যে শুনি যদি ভালা না হয়, যদি মাইরা ফ্যালায়, যদি দেয় ছ্যাকা কী করুম আমি, যামু কার কাছে, কার কাছে কমু তর কথা ? মায়ের কথায় হাসে মেয়ে, কী হইবো মা, আর হইলে হইবো খিদায় তো ভাত পামুরে মা, ভাত পামু , সহ্য হয় না খিদা।। মনস্থির করতে পারে না মা ওইটুকু না বুকের তলার ছা অনেক ভাবনা শেষে দেয় লাগিয়ে কাজে উঁচু তলার ফ্ল্যাটে দিন যায় যায় মাস ...... ক্ষুধায় শীর্ণ সোনামণি পড়ে থাকে রাস্তায় একদিন ‘কই গেলিরে তুই’- বাতাসে ছড়ায় মায়ের করুণ কান্না সোনামণিরে---- ..................................... পার্ক স্ট্রিটের সেই সাহসিনীকে ঝ র্ণা চ ট্টো পা ধ্যায় ভালোমন্দ কিছুই জানিনা কানে ভাসে রোদনের স্বর নিস্তব্ধ দুপুরে টিভি খুলে চোখে পড়ে কেউ কিছু বলে যায় ….. ধীরে, অতিধীরে কারো হাতে হয়েছে তোমার লাঞ্ছনা কিংবা বলা ভালো তোমার মরণ ... ছুটে যায় আছে যত সাজানো স্বজন কাটা-ছেঁড়া করে তারা হৃত সেই ক্ষণ কোনটা আগে গেলো কি তুমি দিয়েছিলে.... দেহ, না মন এই শুধু আলোচনা, এই হ’ল কাজ ভদ্রজন আছে যত, যারা হল সুশীল সমাজ আজ তুমি একা নও...... এক কোণে কাঁদে দেখ, বধির সেই মেয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে গোলামের বিবি এক কোণে চুপ করে ভিখারিনী নারী আরো আছে মাথা নীচু আমি, তুমি, তুমি...... , তুমি এখনও নীরব কেন থাকি কেন তুমি হয়ে আছো দুখীনি তামসী এবার এগিয়ে এস আলোকবর্তিনী হোক সব পুড়ে ছাই আগুন আলোয় শরীর চাইনা আর ফিরে চাই ‘আমাদের শুদ্ধ হৃদয়’ ........................................ সত্যি নন্দিতা ভট্টাচার্য গন্ডির ভেতর লক্ষণরেখা পেরোলেই একমুঠো রদ্দুর ! সীতা, সাবিত্রী সাধ্বী সাধনায় তুড়ি মারলেই এক উঠান নীলাকাশ ! সত্যি ! কি বোকারে !