তন্ময় সিংহ রায়
1K views • 8 hours ago
ছেলেটি আর ফেরেনি!!
তন্ময় সিংহ রায়
সেদিনও ভোর হয়েছিল
এ পৃথিবীর বুক চিরে।
সূর্যের তীব্র আলো এসে পড়েছিল
তামাম লোকালয়ে।
শুধু একটি ঘরের অন্ধকূপে
কোনও ভোর নামেনি।
কাঠের জীর্ণ দরজাটা খোলা রেখে
মা দাঁড়িয়ে ছিলেন পথ পানে চেয়ে।
যেতে যেতে ছেলেটি
আঁচল ছুঁয়ে বলেছিল,
“দেশটা স্বাধীন হলে
আমি ঠিক ফিরে আসব, মা।”
তারপর;
দেশ স্বাধীন হলো।
রাস্তায় রাস্তায় উৎসবে ভেসে গেল
অজস্র মানুষ।
তোপধ্বনি আর আতশবাজির আলোয়
কেঁপে উঠল আকাশ।
শুধু সেই উঠোনের এক চিলতে কোণে
অন্ধকার হয়ে থমকে রইল
আস্ত একটা শূন্যতা।
ছেলেটি আর ফেরেনি।
বছরের পর বছর কেটে গেল।
মহাকালের ঘূর্ণীতে ধুয়ে গেল
কত রাজত্ব, কত কোলাহল,
কত মুখ, কত নাম।
ইতিহাস তার পাতা উল্টে
এগিয়ে গেল বহুদূর।
কেবল সেই ভেজা বারান্দায়
বসে থাকা ছানি পড়া মায়ের চোখ
এগোতে পারল না।
তার কাছে স্বাধীনতার
এত বড় ইতিহাসও একদিন
ফিকে হয়ে গেল,
এক জোড়া চেনা পায়ের শব্দের
তীব্র অপেক্ষার কাছে।
আজও আকাশে
পতপত করে পতাকা ওড়ে।
বাতাসের মাতন
তাকে ছুঁয়ে যায় পরম সোহাগে।
আমরা বুকের ছাতি চওড়া করে
দাঁড়িয়ে যাই অহঙ্কারের মিছিলে।
কিন্তু;
আমরা কি একবারও
চোখ নামিয়ে দেখেছি?
ঐ সুবিশাল পতাকাদণ্ডের ঠিক নিচে
কত হাজার মানুষের শেষ দীর্ঘশ্বাস
মাটির ভিজে শ্যাওলায়
নিঃশব্দে শুকিয়ে গেছে?
কত মা
একটি দরজা খোলা রেখে
আজও বসে আছেন?
কত ঘর
তাদের প্রিয় মানুষের ফিরে আসার অপেক্ষায়
নিজেদের ভেতরেই
ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হয়ে গেছে?
তার খবর
কোনও ইতিহাস রাখে না।
কারণ ইতিহাস
তারিখ মনে রাখে,
যুদ্ধের নাম লিখে রাখে,
বিজয়ের হিসেব মনে রাখে;
কিন্তু একটা মায়ের
শেষ রাতের কান্না
কোনও পাতায় লেখা থাকে না।
কোনও তোপধ্বনির শব্দে
সেই রক্তের ঋণ শোধ হয় না।
যে মানুষটি দেশের নামে
বিলীন হয়ে গেল,
সে তো কোনও রূপকথার
পাথরের মূর্তি ছিল না।
তারও তো খুব বাঁচতে ইচ্ছে করত।
মায়ের হাতের
এক মুঠো ধোঁয়া ওঠা ভাত,
বাবার কাঁধে হাত রেখে
হেঁটে যাওয়ার নীরব গোধূলি,
একটি ছোট্ট ঘর,
আর একটি সাধারণ, শান্ত সকাল;
এ তো খুব বেশি চাওয়া ছিল না।
হয়তো তারও মনে হয়েছিল,
একদিন সব শেষ হলে
সে ফিরে আসবে।
হয়তো বাড়ির জন্য
কিছু একটা কিনে আনবে।
হয়তো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে
একবার শুধু ডাকবে—
“মা...!”
কিন্তু স্বাধীনতার ভোর
তার ঘরে পৌঁছেছিল
একজন অনুপস্থিত মানুষকে নিয়ে।
অথচ,
আমাদের একটি মুক্ত নিঃশ্বাস
কিনে দেওয়ার জন্য,
সে নিজের গোটা জীবনকে
নির্দ্বিধায় তুলে দিয়েছিল
মৃত্যুর শীতল হাতে!
একটা স্বাধীন সকাল
উপহার দিতে গিয়ে;
সে নিজের ঘরের
সমস্ত প্রদীপ
চিরতরে নিভিয়ে দিয়ে গেল।
তাই আজ একবার,
পতাকায় চোখ ছুঁয়ে
মাথা নিচু কোরো।
একবার,
হাঁটু গেড়ে বসো।
মাথা নোয়াও সেই মাটির দিকে,
যেখানে মিশে আছে
না-বলা হাজারও আক্ষেপ,
কোনওদিন না-ফেরা
অসংখ্য পদধ্বনি,
আর এমন কিছু বিদায়
যার কোনও প্রত্যাবর্তন ছিল না।
কারণ এই যে
খোলা আকাশ আজ দেখছ,
এ কেবল স্বাধীনতা আকাশ নয়।
এই আকাশের নীলের নিচে
কোথাও কোথাও আজও,
একটি মায়ের দহন পড়ে আছে,
একটি স্ত্রী’র যন্ত্রণা পড়ে আছে।
আর পড়ে আছে,
অবুঝ সন্তানের অপেক্ষা!
কান পেতে শোনো,
এখানকার বাতাসে আজও
করুন সুরে ভেসে বেড়ায়
কত শত অসমাপ্ত জীবন,
কত হাজারো অপূর্ন স্বপ্ন,
আর এক বৃদ্ধা মায়ের
শেষ না-হওয়া দীর্ঘশ্বাস!
দেশ স্বাধীন হয়েছিল একদিন।
ইতিহাস তাকে সোনালী বানিয়েছে।
কিন্তু
ইতিহাসের অক্ষরের বাইরেও
আরেকটি ইতিহাস থেকে যায়,
যেখানে কোনও তারিখ নেই।
কোনও বিজয়োল্লাস নেই।
শুধু আছে
একটি খোলা দরজা,
একজোড়া পুরনো চটি,
আর একজন মা
যিনি আজও বিশ্বাস করতে পারেন না,
তাঁর ছেলে আর
কোনদিনও ঘরে ফিরবে না।
এই যে আমরা
প্রতিদিন সহজে নিঃশ্বাস নিই।
এই যে সকাল হলে
ঘরের দরজা খুলে
আকাশের দিকে তাকাই,
ফুসফুস ভরে নিঃশ্বাস নিই।
এই যে নিজের ইচ্ছেমতন
দেশটাকে ভালোবাসি,
সমালোচনা করি,
স্বপ্ন দেখি,
এর পেছনেও তো
কারও অসমাপ্ত জীবনের
ছায়া পড়ে আছে।
সেই স্বাধীনতার
এ বিশাল রক্তঋণ,
আমাদের বিবেককে
প্রতিটা ভোরে, প্রতিটা নিঃশ্বাসে,
একটু একটু করে
শোধ করে যেতে হয়।
কারণ স্বাধীনতা শুধু
একটি দেশকে মুক্ত করার নাম নয়;
স্বাধীনতা মানে—
যে মানুষটি ফিরতে চেয়েও
আর ঘরে ফিরতে পারেনি,
তার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোকেও
বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়া।
আর সেই কারণেই,
স্বাধীনতার সকালে
যখন পতাকা
তার মাথা উঁচু করে বাতাসে দুলবে,
চোখ নামিয়ো
মাটির দিকে।
হয়তো দেখতে পাবে,
আজও পড়ে আছে
কারো বাড়ি ফেরার প্রতিশ্রুতি।
#📢শেয়ারচ্যাট স্পেশাল
#🧡🤍💚স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা 🇮🇳
#📜বঙ্গ সাহিত্য📜
#🙏নমস্কার
#🙏Have a Good Day
3 likes
21 shares