Titli Chakraborty
#অন্তরের_গহীনে
#তিতলি_চক্রবর্ত্তী
#পর্ব_১
[ কপি করা নিষেধ ] #লেখালিখি #গল্প
ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছে। বাইকটা রাস্তার এক সাইডে দাঁড় করিয়ে প্রণয় এগিয়ে গেল শেড দেওয়া দোকানটার দিকে।
একটা সিগারেট ধরাল সে। দোকান বাজার সব প্রায় বন্ধ। রাত সাড়ে এগারোটা বেজে পেরিয়ে গেছে। মাঝ রাস্তায় হঠাৎ গাড়িটা খারাপ হওয়ার জন্য, ঠিক করতে অনেকটা সময় চলে গেল। বৃষ্টিটা একটু ধরে এসছে এতক্ষণে। বাইকটার দিকে এগোতে যাবে ঠিক তখনই মেয়েলি গলায় হালকা কান্নার শব্দ শুনতে পেল সে। অকস্মাৎ এরকম শব্দে থমকে গেল প্রণয়। একটু থেমে আরো ভালো করে শোনার চেষ্টা করল। কি মনে হতে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বেলে এগিয়ে গেল দোকানের পাশের গলি ধরে। কয়েক পা এগোতেই প্রণয়ের খেয়াল হলো বসে কাঁপতে থাকা একটা শরীরের ওপর। হঠাৎ সামনে আলো এসে পড়ায় মেয়েটাও এতক্ষণে মুখ তুলে চেয়েছে তার দিকে। কেঁদে কেটে চোখ মুখ ফুলে উঠেছে মেয়েটার।
প্রণয় কথা বলে, "এত রাতে এখানে একা বসে কাঁদছো কেন? তোমার বাড়ির লোক কোথায়?"
শেষ প্রশ্ন শুনে মেয়েটা যেন আরো কোঁকিয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ পর চোখ মুছে সে কাঁদতে কাঁদতেই বলে, "নেই, কেউ নেই।"
অবাক হয় প্রণয়। "কেউ নেই মানে? কটা বাজে দেখেছো? কোথায় তোমার বাড়ি? চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।"
মেয়েটি যেতে চায় না। প্রণয় এরপর বিরক্ত হয়। তার চলে যেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু তারপর ভাবে মেয়েটাকে এখানে একা ফেলে যাওয়াটা ঠিক হবে না। তাই বিরক্তি চাপা দিয়ে শান্ত গলায় জানতে চায়, "কীসের এতো কষ্ট? বলো কেন বাড়ি যেতে চাও না? " এরপর মেয়েটি জানাল, তার মায়ের অসুখ ছিল। দু সপ্তাহ আগে উনি এক্সপায়ার করে গেছেন। বছর ছয়েক আগে ওর বাবাও গত হয়েছেন। বাড়িতে আর কেউ নেই। সে একা।
সব শুনে প্রণয় বলল, "দেখো, এখন এখানে এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়। তুমি চলো আমি দিয়ে আসছি।"
মেয়েটি বলে, "ওই ফাঁকা বাড়ি আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। সবটাতে মায়ের স্মৃতি জড়িয়ে।"
-আমি বুঝতে পারছি এই মুহূর্তে তোমার মনের অবস্থা ঠিক কি হতে পারে। কিন্তু তুমি বলো, এই এত রাতে এখানে তুমি কী করে থাকবে!
- সত্যিই তো। কেমন নির্বোধের মতো এখানে থাকতে চাইছে সে। এটা তো ঠিক নয়। তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রণয়কে বলে, "বাড়ি যাবো।" প্রণয় হালকা হাসে। মেয়েটি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যেতে যায়। প্রণয় ধরে ফেলে, "সাবধানে।" এরপর শক্ত হাতে মেয়েটির হাত ধরে এগোতে থাকে বাইকের দিকে।
সকাল সকাল হঠাৎ আসা নোটিফিকেশনের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় প্রণয়ের। রাহা ওকে "থ্যাংক ইউ" পাঠিয়েছে। ফোন নামিয়ে রেখে মনে করে কাল রাতের কথা। কাল রাহাকে পৌঁছে দেবার পর অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজের ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছে প্রণয়। বলেছে, কোন কিছু প্রয়োজন হলে ওকে জানাতে।
মেয়েটার প্রতি যেন দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে ও।
প্রণয় রায়, 'কথাকলি' রেস্টুরেন্টের মালিক দৈবায়ত রায়ের বড়ো ছেলে। ওনার ছোটো মেয়ে তনয়া সবে মাত্র মাধ্যমিক দিয়ে ক্লাস ইলেভেনে উঠেছে। প্রণয় গত তিনবছর ভীষণ খেটে নিজের কোম্পানিটাকে দাঁড় করিয়েছে। গত এক সপ্তাহ হল প্রণয় ত্রিশে পড়েছে। প্রণয়ের মা আশাবরীদেবী খুব শান্ত শিষ্ট মানুষ। ছেলের সব সিদ্ধান্তকে আজ অবধি গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। দৈবায়ত রায়ও প্রণয়কে ছোটো থেকে দায়িত্বশীল ও নিষ্ঠাবান হওয়ার শিক্ষা দিয়ে এসেছেন। আর দেরী না করে বিছানা ছেড়ে ওঠে প্রণয়।
আশাবরীদেবী রান্নাঘরে ব্যস্ত। তনয়া সোফায় বসে টিভি দেখতে দেখতে স্যান্ডউইচ খাচ্ছে। প্রণয়কে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে বলে, "দাদা, যাবার সময় আমায় একটু বইয়ের দোকানে নামিয়ে দিস তো। ওখানে রোহিনী থাকবে। আমি ওর সাথে স্কুল চলে যাবো।"
-আচ্ছা।
আশাবরীদেবী ছেলের জন্য খাবার নিয়ে এলে প্রণয় তাড়াহুড়ো করে খাওয়া শেষ করে ওপরে চলে যায়। একটা ফুল স্লিভ পার্পেল শার্ট আর প্যান্ট পড়ে নীচে নামে। তারপর তনয়াকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। কোম্পানিতে এসেও প্রণয়কে অন্যমনস্ক দেখে ওর অ্যাসিস্টেন্ট মৃদুল অবাক হয়ে গেল। আজ অবধি কখনও এমনটা হয়নি। কোম্পানির প্রতিটা কাজের ব্যাপারে প্রণয় ভীষণ সিরিয়াস। তবে আজ হঠাৎ এমন কেন! যদিও মৃদুল কাজের জায়গায় প্রণয়ের অ্যসিস্টেন্ট হলেও ওর বন্ধু বেশি। তাই ওকে একটু মজা করেই জিজ্ঞেস করে , "কী হয়েছে বলতো? প্রণয় রায় এমন অন্যমনস্ক! কাজে মন নেই। তা কে তোর মন কাড়লো শুনি?" প্রণয় চিন্তিত মুখে তাকায় ওর দিকে। বলে, "একটু ব্ল্যাক কফি নিয়ে আয়, বলছি।"
মৃদুল আর কথা না বাড়িয়ে কিছুক্ষণ পর কফি নিয়ে হাজির হলো। প্রনয় জানালো গত রাতের সব ঘটনা।
- "এখন কী করবি?" মৃদুল জানতে চাইলো।
- আপাতত এখান থেকে বেরিয়ে ওর বাড়ি যাবো। বুঝতে পারছি না ও ঠিক আছে কি না।
- যা তাহলে, আমি এদিকটা সামলে নিচ্ছি।
- "ওকে।"
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় প্রণয়। বেরিয়ে পড়ে, গন্তব্য রাহার বাড়ি। রাহাদের একতলা বাড়ি। বাড়ির ওপরে লেখা 'সেন ভিলা' দেখে এগিয়ে যায় প্রণয়। দরজায় হাত দিতেই দরজাটা খুলে যায়। "উফ বোকার মতো কাজ, একা একজন মেয়ে। এভাবে দরজা খুলে রাখে কেউ!!" নিজের মনেই বিড়বিড় করে। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে পিছনে ফিরেই থেমে যায় প্রণয়। রাহা সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। চুল দিয়ে টপ টপ করে জল পরছে ওর। সেগুলো টাওয়াল দিয়ে মুছতে ব্যস্ত ও।
প্রণয় এক পা-ও যেন এগোতে পারছে না। কী স্নিগ্ধ লাগছে রাহাকে। কাল ভালো করে লক্ষ্য করেনি খুব বেশি হলে ওর বয়স উনিশ কি বিশ হবে। প্রণয়ের মনে হল, সারাজীবন যদি ওকে চোখের সামনে রেখে দেওয়া যেত।
- "একি আপনি! এখন!"
রাহার কথাতে ঘোর কাটে প্রণয়ের। সে আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় ওর দিকে। "দেখতে এলাম। যদি কিছুর প্রয়োজন পড়ে।"
- "ওহ আসুন।"
প্রণয় গিয়ে সামনে থাকা একটা চেয়ার টেনে বসে।
- "কাল মন টা একটু বেশিই খারাপ ছিল। আপনাকে আমার জন্য অনেক ঝামেলায় পড়তে হল। সরি।"
প্রণয় একদৃষ্টে চেয়ে আছে রাহার দিকে। উত্তর না পেয়ে রাহা মুখ তুলে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ে ওর। লজ্জায় সে "আমি মিষ্টি আনি। আপনি বসুন।" বলে রান্নাঘরের দিকে যেতে যাবে তখনই প্রণয় উঠে ওর হাত টেনে ধরে। সামান্য হেসে বলে "আজ থাক, অন্যদিন আসবো।"
সন্ধ্যে হয়ে গেছে। জানালার বাইরে দিয়ে রাহা তাকিয়ে আছে। রাস্তায় কত লোকের আনাগোনা। সেদিন দুপুরের ঘটনাটা মনে করতে গিয়ে মুখে হাসি ফোটে রাহার। দুই সপ্তাহ কেটে গেছে। তবুও সেদিন প্রণয়ের ওইভাবে ওর দিকে তাকিয়ে থাকাটা ভুলতে পারেনি রাহা। বার বার মনে পড়ে আর লজ্জাও পায় সে। এইরকম স্মার্ট, চাপ দাড়ি যুক্ত, লম্বা, সুদর্শন যে মানুষটা ওকে দায়িত্ব নিয়ে প্রথমদিন বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল তার প্রতি ভালোলাগাটা দিন দিন একটু বেড়ে চলেছে রাহার। ফোনে কথা না হলেও মেসেজে অল্প কিছু কথা ওদের হয়। এরমধ্যেই রাহা জেনে গিয়েছে প্রণয়ের নিজস্ব কোম্পানির ব্যাপারে। ফোনের শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়ে ওর। ফোন রিসিভ করেই ওপাশ থেকে শুনতে পায়,
- "একটা ফোন করতে ইচ্ছে হয় না বল?"
হঠাৎ কী মনে করে রাহা বলে- "সরি সরি কৃতী। হ্যাপি বার্থ ডে মাই ডিয়ার বেস্টি।"
- "হয়েছে হয়েছে। থাক আর সরি বলতে হবে না। এবারের মতো ছেড়ে দিলাম।"
শব্দ করে হেসে ওঠে রাহা। কৃতী আবার বলে,
- "তবে সারাদিন পেরিয়ে গেল। তোর একবারও আমার কথা মনে পড়লো না বল? "
- "তোকে ভুলে যাবো সেটা হয়! তুই আমার সোনা বেস্টি না! খুব আনন্দ কর। "
- "শোন না রাহা আমার একটা ইম্পরট্যান্ট কল আসছে। পরে কথা বলি? টাটা"
- "ওকে।"