কবি আনজারুল (সাহিত্য দূত)
577 views • 14 days ago
স্মৃতির সিন্ধুক
একটি কপিরাইট-ফ্রি বিয়োগান্ত গল্প
লেখক: আনজারুল মোল্লা
গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়ি। সেই বাড়ির এক কোণে রাখা ছিল ছোট্ট একটি কাঠের সিন্ধুক। বাইরে থেকে দেখলে সেটি সাধারণ একটি বাক্স মনে হতো, কিন্তু বৃদ্ধ আজিম মিয়ার কাছে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
প্রতিদিন বিকেলে তিনি সিন্ধুকের ধুলো মুছতেন, তালা খুলে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকতেন, তারপর আবার বন্ধ করে দিতেন। গ্রামের লোকেরা ভাবত, নিশ্চয়ই সেখানে অনেক সোনা-দানা লুকিয়ে আছে। কিন্তু কেউ জানত না, সেই সিন্ধুকে জমা ছিল কেবল স্মৃতি।
একদিন শহর থেকে তার নাতি আরিব এল। সে আধুনিক জীবনের ছেলে। পুরোনো জিনিসের প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। দাদুকে প্রতিদিন সেই বাক্সের সামনে বসে থাকতে দেখে সে হেসে বলল,
— “দাদু, এত পুরোনো বাক্সে এমন কী আছে?”
আজিম মিয়া মৃদু হেসে বললেন,
— “যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না।”
কয়েক দিন পর বৃদ্ধ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি আরিবের হাত ধরে বললেন,
— “আমি চলে গেলে সিন্ধুকটা খুলে দেখিস। তবে তাড়াহুড়ো করে নয়, মন শান্ত হলে খুলবি।”
সেই রাতেই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন।
দাফনের পর বাড়িটা যেন আরও নিঃশব্দ হয়ে গেল। কয়েক দিন পর এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে আরিব দাদুর কথা মনে করে সিন্ধুকটি খুলল।
ভেতরে কোনো স্বর্ণালঙ্কার ছিল না। ছিল কিছু হলদে হয়ে যাওয়া চিঠি, তার দাদির শাড়ির একটি ছোট্ট টুকরো, বাবার শৈশবের আঁকা ছবি, মায়ের লেখা প্রথম চিঠি, একটি ভাঙা হাতঘড়ি, শুকিয়ে যাওয়া একটি গোলাপ, আর একটি ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
"যে মানুষ স্মৃতিকে যত্নে রাখে, সে কখনো একা হয় না। আর যে মানুষ আপনজনকে হারায়, তার কাছে স্মৃতিই সবচেয়ে বড় আশ্রয়।"
পাতা উল্টাতে উল্টাতে আরিব জানতে পারল এমন সব গল্প, যা কেউ তাকে কখনো বলেনি। জানতে পারল, তার দাদি সংসার বাঁচাতে নিজের গয়না বিক্রি করেছিলেন। তার বাবা উচ্চশিক্ষার জন্য বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় এই সিন্ধুকেই রেখে গিয়েছিলেন প্রথম আঁকা ছবিটি। আর দাদু প্রতিটি স্মৃতিকে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন—জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু ভালোবাসার স্মৃতি কখনো মরে না।
ডায়েরির শেষ পাতায় কাঁপা হাতে লেখা ছিল—
"যদি কোনো দিন এই সিন্ধুক খুলে দেখো, বুঝে নিও আমি তখন আর নেই। আমার জন্য কেঁদো না। শুধু এই স্মৃতিগুলোকে ফেলে দিও না। কারণ মানুষ চলে যায়, স্মৃতিই তার শেষ পরিচয় হয়ে বেঁচে থাকে।"
আরিবের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, দাদু রেখে গেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সম্পদ—ভালোবাসার ইতিহাস।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তখনও শেষ হয়নি।
কয়েক মাস পরে শহরে ফেরার আগে বাড়িটি বিক্রি হয়ে যায়। নতুন মালিক পুরোনো আসবাবপত্রের সঙ্গে সেই কাঠের সিন্ধুকটিকেও অপ্রয়োজনীয় ভেবে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন।
যখন খবরটি আরিবের কাছে পৌঁছাল, তখন আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ছাইয়ের মধ্যে পড়ে ছিল শুধু একটি আধপোড়া ডায়েরির পাতা। সেখানে আগুনেও পুরোপুরি মুছে যায়নি একটি বাক্য—
"ভালোবাসা আগুনে পোড়ে না, পোড়ে শুধু তাকে ধরে রাখার বস্তুগুলো।"
সেদিন আরিব ছাই হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। সে বুঝেছিল, মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন স্মৃতি তৈরি করে, কিন্তু স্মৃতিকে যত্নে না রাখলে একদিন ইতিহাসও ছাই হয়ে যায়।
সেই দিন থেকে আরিব একটি নতুন অভ্যাস গড়ে তোলে। সে প্রতিটি প্রিয় মুহূর্ত লিখে রাখে, পরিবারের মানুষের ছবি সংরক্ষণ করে, আর সন্তানদের বলে—
“টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি আর কখনো ফিরে আসে না।” #📜বঙ্গ সাহিত্য📜 #📰দেশের আপডেট📰 #📢শেয়ারচ্যাট স্পেশাল #📰জেলার আপডেট📰 #😊সেরা কবিদের কবিতা✍️
10 shares