‘শিক্ষা সংস্কারক বিদ্যাসাগর’ নিজের সমস্ত কর্ম-প্রচেষ্টাতেই সবকিছু যাতে বেশ একটি সুনিয়ন্ত্রিত পথ ধরে এগিয়ে চলে—এই উদ্দেশ্যে একটি পূর্ব-পরিকল্পিত কর্মসূচী অনুসরণ করাই পণ্ডিত বিদ্যাসাগরের কর্মজীবনের বিশেষ রীতি ছিল। বিশেষ করে শিক্ষার সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর বিভিন্ন কর্ম-প্রচেষ্টায় তিনি যে এই রীতিটিই অবলম্বন করেছিলেন, একথা বেশ জোরের সঙ্গেই বলা চলে। এবিষয়ে তাঁর নিজস্ব একটি পদ্ধতি ছিল যেটিকে অনুসরণ করে তিনি তখনকার দিনের তরুণদের এমন একটি সর্বাঙ্গিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে তাঁরা নিজেরাই এক-একটি দীপশিখার মত তাঁদের চতুর্দিকে জ্ঞানের আলো বিকিরণ করতে পারেন। আর একাজের জন্য বিভিন্ন শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা এবং সেগুলির সুষ্ঠু পরিচালনাও তাঁর এই কর্মসূচীর আরেকটি দিক ছিল। কিন্তু একইসাথে এর আরও কতকগুলি দিক ছিল যেগুলো ইতিহাসে উপেক্ষণীয় নয়। যেমন—বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকের সুপরিকল্পিত প্রকাশনাও এবিষয়ে পণ্ডিত বিদ্যাসাগরের কাজের একটি লক্ষ্যণীয় অংশ ছিল। তাছাড়া ঠিক কি কি বিষয় শিক্ষা দেওয়া হলে ছাত্ররা নিজেদের ভাবপ্রকাশ করবার ক্ষমতা অর্জন করতে পারবেন—এই প্রশ্নটিও বিদ্যাসাগরের সময়কার বাংলায় কম কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আর তাই ঊনিশ শতকের বাংলার ইতিহাসের একটি সঙ্কট সময়ে তিনি ঠিক কি উপায়ে এসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে এগুলির সমাধান করেছিলেন, এটাও ইতিহাসে বিশেষভাবে প্রণিধানের যোগ্য। বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, খৃষ্টীয় ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের একটি চিত্তাকর্ষক সময় উপস্থিত হয়েছিল। এসময়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে প্রাচীন সংস্কৃতির সঙ্ঘাত অনেকগুলি নতুন শক্তির উৎসমুখকে খুলে দিয়েছিল, এবং সেই শক্তিপ্রবাহের উজান-ভাটির আবর্তে পড়ে বাংলা ও বাঙালির অবস্থাটা তখন খুব জটিল হয়ে উঠেছিল। এরফলে তখন ধর্মের ক্ষেত্রে যে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছিল, সেটার একদিকে ছিল প্রতীক নিয়ে উপাসনা—সমকালীন খৃষ্টান ধর্মযাজকেরা যেটাকে পুতুল-পূজা আখ্যা দিয়ে অত্যন্ত নিন্দা করেছিলেন; আর অন্যদিকে ছিল খৃষ্টানদের গির্জায় প্রচারিত নিরাকার উপাসনা পদ্ধতি। আর এসময়ে এই বিতর্ক থেকেই একটি নতুন ধর্মের জন্মও হয়ে গিয়েছিল। বলাই বাহুল্য যে, এধরণের পরিস্থিতিতে তখনকার হিন্দু যুবসম্প্রদায়কে একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ফলে এসময়ের হিন্দু যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে মূলতঃ তিনটি প্রশ্ন নিয়ে বাদ-বিবাদ দেখা দিয়েছিল— (১) পুতুল-পূজার বিধান আছে বলে ডিরোজিওর অনুগামীদের মত তাঁরাও হিন্দুধর্মকে অত্যন্ত হেয় বলে প্রচার করে কি খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করবেন? (২) নাকি মিশনারিদের পীড়াপীড়িতে কান না দিয়ে চিরাচরিত প্রথায় নিজেদের ধর্মানুষ্ঠানগুলিকেই আঁকড়ে ধরে থাকবেন? (৩) নাকি এসময়ে তৃতীয় যে একটি পথের সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি অনুসরণ করে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ দ্বারা গঠিত মধ্যপথাবলম্বী নতুন ধর্মীয় ভ্রাতৃসঙ্গে যোগ দেবেন? বলাই বাহুল্য যে, তখনকার এই সমস্যাসঙ্কুল অবস্থাতে কোন একটি স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটা তাঁদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে গিয়েছিল; এবং এর প্রায় একপুরুষ কাল অতীত হওয়ার পরে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং তাঁর সুযোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ এবিষয়ে তাঁদের একটা সমাধানের পথের সন্ধান না দেওয়া পর্যন্ত সমগ্র বিষয়টি তাঁদের কাছে কঠিন হয়েই থেকে গিয়েছিল। সমকালে শিক্ষার ক্ষেত্রেও, তাঁরা ঠিক কোন শিক্ষা-পদ্ধতি অনুসরণ করবেন—এবিষয়েও তাঁদের একইরকমের একটি পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল। যার একদিকে ছিল প্রাচীন পদ্ধতির শিক্ষার আকর্ষণ, যেটার জন্য বিজাতীয় শাসকেরাও তখন যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন; আর অন্যদিকে ছিল তখন যেধরণের পাশ্চাত্য শিক্ষা হিন্দুকলেজ ও বিভিন্ন মিশনারি কলেজগুলিতে দেওয়া হত—সেসবের অধিকতর মনোজ্ঞ আকর্ষণ। সেযুগের বিজাতীয় সরকার এই দ্বিতীয় পদ্ধতির শিক্ষাকে তাঁদের আনুকূল্য দান করে এটির প্রচারের সুযোগ প্রসারিত করবার জন্য মফঃস্বলের নানা জায়গায় জেলা স্কুল স্থাপন করে দিয়েছিলেন। এরফলে সমকালীন বাঙালি যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে যে প্রশ্নগুলি উঠেছিল, সেগুলি হিল যে— (১) তাঁরা কি বিজাতীয় সরকার কর্তৃক প্রচারিত দ্বিতীয় শিক্ষা-পদ্ধতিটিই গ্রহণ করবেন? (২) ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা অর্জন যেহেতু শিক্ষার একটি সারাংশ, সেহেতু এই ভাবপ্রকাশের মাধ্যম কি তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা হবে? (৩) যদি ভাবপ্রকাশের মাধ্যম হিসাবে বাংলাকেই তাঁরা গ্রহণ করে নেন তাহলে তাতে তাঁদের অভীষ্ট ফললাভ কি সম্ভব হবে? (৪) যেহেতু সেকালের বাংলা গদ্যের অবস্থা অত্যন্তই অপরিণত ছিল, সেহেতু তাঁরা কি ইংরেজিকেই নিজেদের মাধ্যম বলে স্বীকার করে নেবেন? এক্ষেত্রে স্মরণীয় যে, আলোচ্য সময়ে ইংরেজির আকর্ষণ একাধিক রকমের ছিল এবং এর গদ্যসাহিত্য অতি চমৎকার বলে গণ্য হত। এছাড়া এই ভাষাটি তখন শাসক-সম্প্রদায়ের ভাষা বলে এর মর্যাদাও অপরিমেয় ছিল। ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে বাঙালি যুবসম্প্রদায় তখন কোন পথ অবলম্বন করবেন, এটা স্থির করা তাঁদের পক্ষে কোন সহজসাধ্য বিষয় ছিল না। ইতিহাস বলে যে, একইসময়ে পণ্ডিত বিদ্যাসাগরও শিক্ষার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন, এবং শেষপর্যন্ত এবিষয়ে এমন একটি সমাধানে পৌঁছেছিলেন—যা তখনকার প্রচলিত মতের বিরোধী হলেও তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক ছিল। সবদিক বিবেচনা করে তিনি তখন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন যে, বাংলা ভাষাকেই শিক্ষিত বাঙালিদের ভাবপ্রকাশের মাধ্যম হতে হবে। কিন্তু তখনও পর্যন্ত যেহেতু বাংলা ভাষা যথেষ্ট পরিণত অবস্থায় পৌঁছায়নি, সেহেতু তিনি একইসাথে এটাও ঠিক করেছিলেন যে, ছাত্রদের জন্য সংস্কৃত ভাষারও একটি পাঠক্রমের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাঁর মত ছিল যে, সংস্কৃত ভাষাজ্ঞানের বনিয়াদ তৈরি হলে বাংলায় তারা আরও ভাল করে নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতে সমর্থ হবেন, কিন্তু সত্যিকারের বিজ্ঞান-ভিত্তিক জ্ঞান প্রচার করাই এবিষয়ে তাঁদের মূল কর্তব্য হবে। আর এজন্য ইংরেজি ভাষাতেও পারদর্শী হওয়াটা তাঁদের পক্ষে অপরিহার্য হতে হবে, যাতে তাঁরা সেযুগের বিজ্ঞান-সম্বন্ধীয় বিদ্যাগুলি অধিগত করতে পারেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, এই পদ্ধতি অনুসরণ করে বাঙালি যুবসম্প্রদায়কে শিক্ষা দিলে তাঁদের মধ্যে থেকে এমন একদল ছাত্র তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসবেন, যাঁরা সত্যিকারের জ্ঞানের বর্তিকাবাহী অগ্রদূত হবেন। ইংরেজি শিক্ষার সাহায্যে তাঁরা নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ করবেন, আর সংস্কৃত ভাষা আয়ত্ত করবার ফলে মাতৃভাষায় তাঁদের ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তখন এপ্রসঙ্গে এডুকেশন কমিটির তৎকালীন সেক্রেটারি ডাঃ মুয়াটের সঙ্গে তিনি যে পত্রলাপ করেছিলেন, তাতে তিনি নিজের এই পরিকল্পনাকে একটা সুস্পষ্ট রূপ দিয়েছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। ঊনিশ শতকের কলকাতার সংস্কৃত কলেজ পরিদর্শন করবার পরে ডঃ ব্যালান্টাইনের কতগুলি সুপারিশের ফলে তখন যে বিতর্কে বিদ্যাসাগর জড়িত হয়ে পড়েছিলেন, মুয়াটের কাছে পত্রে লেখা তাঁর বক্তব্যগুলি সেসবেরই একটি অঙ্গ ছিল। আসলে ওই সময়ে যখন ডঃ ব্যালান্টাইনের সুপারিশের অনেকগুলিকে কাজে রূপায়িত করাটা সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষরূপে পণ্ডিত বিদ্যাসাগরের কঠিন বলে মনে হচ্ছিল এবং বিদেশী কর্তৃপক্ষ যখন এবিষয়ে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে সেই সুপারিশগুলো রূপায়িত করবার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর মধ্যেকার শক্তিধর মানুষটি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। যারফলে তখন শিক্ষা বিষয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছিল। এবারে দেখা যাক যে, শিক্ষাদান বিষয়ে তাঁর নিজের পরিকল্পনাটি নিয়ে তিনি তখন নিজে কি বলেছিলেন। এবিষয়ে ১৮৫০ সালের ৫ই অক্টোবর তারিখে ডঃ মুয়াটকে তিনি নিজের মতামত সম্বলিত যে ইংরেজি পত্রটি লিখেছিলেন, সেটার কিছুটা অংশের বঙ্গানুবাদের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে, যা নিম্নরূপ ছিল— “বাংলায় যথোপযুক্ত ব্যুৎপত্তি যাতে তাঁরা অর্জন করতে পারে সেজন্য প্রথমে তাঁদের সংস্কৃত শিখিয়ে তারপর ইংরেজীতে তাঁদের সত্যিকারের জ্ঞান দান করবার স্বাধীনতা যদি আমাকে দেওয়া হয়, আর আমার এই কাজে যদি আমাকে এডুকেশন কমিটি থেকে সাহায্য এবং উৎসাহ দেওয়া হয়, তাহলে আমি আপনাকে কথা দিতে পারি যে, কয়েক বছরের মধ্যে, এমন একদল ছাত্রকে আমি তৈরি করে দেব, যাঁরা তাঁদের লেখার এবং শেখাবার ক্ষমতার গুণে এমন যোগ্যতার সঙ্গে জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের কাজে সহায়তা করবে, যেমনটি আপনাদের ইংলণ্ডস্থ বা ভারতীয় কোনো কলেজের উৎকৃষ্ট ছাত্র বলে পরিগণিত কারও দ্বারা সম্ভব নয়।” শিক্ষা বিষয়ে বিদ্যাসাগরের পরিকল্পনার যেসব বৈশিষ্ট ছিল, সেগুলি সম্বন্ধে তাঁর এই পত্রটি থেকে মোটামুটি পরিষ্কার একটা ধারণা করা যায়। তাঁর মত ছিল যে, শিক্ষার্থীকে আত্মপ্রকাশের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে, এবং এই কাজটি শিক্ষার্থীরা তাঁদের মাতৃভাষাতেই সবথেকে ভালোভাবে করতে পারবেন। কিন্তু এই ক্ষমতা যথোপযুক্তভাবে আয়ত্ত করতে হলে সংস্কৃত ভাষাতে তাঁদের একটা গোড়াপত্তন হওয়ার দরকার রয়েছে; কারণ, এই ভাষার সাহিত্য একদিকে যেমন নিঃসন্দেহে পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্যগুলির মধ্যে সবথেকে ঐশ্বর্য-সম্পন্ন, অন্যদিকে তেমনি বাংলা ভাষার সঙ্গেও এর নাড়ীর যোগ রয়েছে। কিন্তু জ্ঞানালোক বিতরণের সত্যিকারের সহায়ক হতে হলে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় শিক্ষালাভেরও প্রয়োজন রয়েছে, কেননা বিদ্যাসাগরের সময়ে এই ভাষার সাহায্যেই বিজ্ঞানচর্চার সর্বাধুনিক ফল সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করা সম্ভবপর ছিল। এরপরে নিজের এই পরিকল্পনা অনুযায়ী পণ্ডিত বিদ্যাসাগর কাজগুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কতগুলি সুপ্রাচীন ও সর্বোৎকৃষ্ট সংস্কৃত গ্রন্থ ও বিভিন্ন পাঠক্রমের উপযুক্ত বাংলা পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনার একটি কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন। আর তাঁর এই কর্মসূচীর প্রথমধাপে এসব গ্রন্থ প্রকাশ করবার জন্য তখন একটি ছাপাখানার প্রয়োজন হয়েছিল, যারফলে ১৮৪৭ সালে তাঁর উদ্যোগে সংস্কৃত প্রেস স্থাপিত হয়েছিল। প্রথমে মদনমোহন তর্কালঙ্কার এতে তাঁর শরিক হলেও পরে বিদ্যাসাগর এই প্রেসটিকে সম্পূর্ণভাবে নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে নিয়েছিলেন। এরসাথে প্রায় একইসময়ে সংস্কৃত প্রেসের একটি পরিপূরক সংস্থা হিসেবে, প্রেস থেকে প্রকাশিত পুস্তকগুলি মজুত রেখে বিক্রয় করবার জন্য সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরির জন্ম হয়েছিল। এসমস্ত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরে তিনি সুনিয়ন্ত্রিতভাবে তিনটি শ্রেণীর গ্রন্থ প্রকাশ করবার একটি বিরাট পরিকল্পনা নিয়ে আসল কর্মযুদ্ধে অবতীর্ন হয়েছিলেন। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীতে ছিল তাঁর স্বরচিত সংস্কৃত ব্যাকরণের কয়েকটি বই, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ছিল অত্যন্ত যত্নসহকারে সম্পাদিত প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাবলী, আর তৃতীয় শ্রেণীতে ছিল—একেবারে নীচতলা থেকে শুরু করে এক-এক তলা করে উঠে সেকালের শিক্ষাক্ষেত্রের সর্বোচ্চ তলায়—যেখানে ভাষার উপরে শিক্ষার্থীর দখল সম্পূর্ণ হচ্ছিল, সেগুলির সবকটি তলার উপযুক্ত করে তাঁর নিজেরই রচিত বাংলা গ্রন্থপরস্পরা। এখানে স্বাভাবিকভাবেই যে প্রশ্নটা চলে আসে, সেটা হল যে, এসময়ে পণ্ডিত বিদ্যাসাগর সংস্কৃত ভাষায় ব্যাকরণের পাঠ্যপুস্তক রচনাতেও প্রবৃত্ত হয়েছিলেন কেন? আসলে এই কাজটি করবার পিছনেও তাঁর যথেষ্ট কারণ ছিল। সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ অধিগত করাকে সংস্কৃত সাহিত্যে প্রবেশের চাবিকাঠি বলা যেতে পারে। কিন্তু প্রাচীন এই ভাষাটির ব্যাকরণের সূত্রগুলি নানা খুঁটিনাটি নিয়ে এতটাই বহু-বিস্তৃত, এবং কারক, ক্রিয়ার কাল ইত্যাদি ভেদে এর মধ্যে নানাধরণের রূপান্তরের সংখ্যা এতটাই বেশি যে, এই ভাষাটিকে আয়ত্ত করা অত্যন্ত আয়াসসাধ্য এবং শ্রমসাপেক্ষ। অতীতের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বাড়াবার জন্যই যেন প্রচলিত ব্যাকরণের সূত্রগুলি কতগুলি সঙ্কেত-ধর্মী সংক্ষিপ্ত ধ্বনি-সমবায়ে লিখিত হত, যথাযোগ্য টীকা-টিপ্পনি ছাড়া যেগুলি তখন এমনিতেই রীতিমত দুর্বোধ্য ছিল। তখনকার দিনের অনুসৃত পদ্ধতি অনুসারে ছাত্রদের দীর্ঘ তিন বছর ধরে ব্যোপদেবের মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ শিক্ষা করানো হত, আর সঙ্কেত-ধর্মী সংক্ষিপ্ত সূত্রগুলির অর্থ বিশেষ না বুঝেই সেগুলি তাঁরা কণ্ঠস্থ করতেন। তখনকার শিক্ষালাভের এই প্রণালী অত্যন্তই ক্লান্তিকর ছিল, এবং এতে যে ফললাভ হত, সেটা একাজের জন্য যে সময় এবং প্রযত্ন ব্যয় করা হত, সে তুলনায় রীতিমত অকিঞ্চিৎকর ছিল। ছাত্রাবস্থায় বিদ্যাসাগর নিজেও এই কষ্টকর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন বলে, তিনি এবিষয়ে নিঃসন্দেহ হয়েছিলেন যে, সংস্কৃত ব্যাকরণ আয়ত্ত করবার সমস্যাটির সমাধানের জন্য আরও যুক্তিসম্মত পথে অগ্রসর হওয়া উচিত। আর একারণেই তিনি তখন দু’স্তরের দুটি ব্যাকরণ লিখেছিলেন। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল আরম্ভকালীন ধরণের, যা সেযুগের শিক্ষার্থীদের মনে সংস্কৃত ব্যাকরণের মূলগত বৈশিষ্টগুলির সম্বন্ধে একটা ধারণা জন্মিয়ে দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছিল। এবিষয়ে তাঁর লেখা ‘উপক্রমণিকা’ গ্রন্থটির নামের মধ্যেই এর পরিচয় পাওয়া যায়। এর উপরের স্তরের ব্যাকরণটির অধ্যয়ন এটিকেই ভিত্তিস্বরূপ করে চলবে—এটাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল। তিনি এর উপরের স্তরের ব্যাকরণটির নাম দিয়েছিলেন ‘ব্যাকরণ-কৌমুদী’ এবং এটি সংস্কৃত ব্যাকরণের সমগ্র ক্ষেত্রটি পরিক্রমা করে তিন ক্ষেপে প্রকাশিত হয়েছিল। এই ব্যাকরণে তিনি মূলতঃ যে ছকটি অনুসরণ করেছিলেন, সেটি এতটাই যুক্তিসম্মত এবং এর বিষয়-বিন্যাস এতটাই সুশৃঙ্খল ছিল যে, সেকালের ছাত্রদের পক্ষে এটিকে আয়ত্তে আনাও সহজ হয়ে গিয়েছিল। পণ্ডিত বিদ্যাসাগর রচিত ব্যাকরণের এই গ্রন্থ দুটির চিরকালীন উৎকর্ষের সবথেকে প্রকৃষ্ট প্রমাণ হল যে, এই কিছুকাল আগেও বাংলার স্কুলগুলিতে সংস্কৃত ব্যাকরণের এই বই-দুটি সবথেকে বেশি সমাদৃত ছিল। বিদ্যাসাগর এই গ্রন্থ দুটি রচনা করবার পরে একশো বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও, এগুলি ছাড়া একসময়ে শিক্ষিত বাঙালি একসময়ে রীতিমত উছূল ছিল। আলোচ্য সময়ের ছাত্রদের সংস্কৃত ব্যাকরণ শেখানো সহজ করবার কাজ হাতে নেওয়ার জন্য বিদ্যাসাগর কিসের দ্বারা প্রবুদ্ধ হয়েছিলেন, এবিষয়ে কৌতুকাবহ একটি গল্প প্রচলিত রয়েছে। সেই কাহিনী অনুসারে, রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন এবং তিনি মাঝে মাঝেই পণ্ডিত বিদ্যাসাগরের বাড়িতে গল্পগাছা করবার জন্য উপস্থিত হতেন। একদিন এরকমভাবে বিদ্যাসাগরের সাথে দেখা করতে এসে তিনি বিদ্যাসাগরের অনুজ দীনবন্ধুকে কালিদাসের মেঘদূতের মূল পাঠ থেকে উচ্চৈঃস্বরে আবৃত্তি করতে শুনেছিলেন। তখন এই আবৃত্তির কথাগুলির ধ্বনি-মাধুর্য তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, অন্য কারো সাহায্য ছাড়াই তিনি যাতে সংস্কৃত সাহিত্যের রসগ্রহণ করতে পারেন, এই উদ্দেশ্যে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করবার জন্য প্রচণ্ড আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তখন সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করবার জন্য একেবারে শুরুতেই যে বেড়াগুলি ডিঙ্গিয়ে ব্যোপদেবের ব্যাকরণে প্রবেশ করতে হত, সেগুলিকে ডিঙাবার মত যথেষ্ট সাহস তিনি সঞ্চয় করতে পারছিলেন না বলে, বিদ্যাসাগর এই সমস্যা থেকে তাঁকে উদ্ধার করবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। এবং এরপরে সমস্ত রাত জেগে তাঁকে সাহায্য করবার জন্য বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ব্যাকরণের একটি কাঠামোর মত তৈরি করে দিয়েছিলেন। কথিত রয়েছে যে, এসময়ে নিজের স্মারকলিপি হিসাবে যেসমস্ত ছোট ছোট মন্তব্যগুলিকে তিনি অন্যত্র লিখে রেখেছিলেন, পরে সেগুলিকেই মাল-মশলারূপে ব্যবহার করে প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কৃত ব্যাকরণটি তিনি বাংলা ভাষায় রচনা করেছিলেন। (বিদ্যাসাগর, চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, পঞ্চম অধ্যায়) যাই হোক, সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রাথমিক দুরূহতার বাধাগুলি অতিক্রম করতে কৃতকার্য হওয়ার পরে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত ভাষার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলি থেকে পাঠাংশ নির্বাচন করে, সেগুলির মধ্যে থেকে সহজ পাঠগুলি থেকে শুরু করে ক্রমশঃ কঠিনতর পাঠ-সম্বলিত বিভিন্ন মানের পাঠ্যপুস্তক রচনার কাজ হাতে নিয়েছিলেন। এরপরেই ১৮৫১-৫২ সালে তিনভাগে ‘ঋজুপাঠ’ নাম দিয়ে তাঁর রচিত এই সঙ্কলন-গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল। এরফলে তখন সংস্কৃত ভাষায় প্রাথমিক জ্ঞানার্জনের কাজটি আগের তুলনায় অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছিল। কাজেই পণ্ডিত বিদ্যাসাগর রচিত এই গ্রন্থগুলি তখন যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছিল, এতে বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ দেখা যায় না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানিয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর পিতৃদেবের স্নেহদৃষ্টির নীচে বসে এই ঋজুপাঠ থেকেই প্রথমবারের জন্য সংস্কৃত সাহিত্যের রসাস্বাদন করেছিলেন। এই ঋজুপাঠ গ্রন্থের দ্বিতীয়ভাগে বাল্মীকির মূল রামায়ণের কতগুলি শ্লোক ছিল। এটি পড়েই প্রাচীন ভারতের প্রথম মহাকবির রচিত এই মহাকাব্যের সঙ্গে বালক রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটেছিল, আর এটা তখন তাঁর কাছে এমনই একটি রোমাঞ্চকর ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল যে, তিনি সাহসে বুক বেঁধে নিজের মাকে গিয়ে নিজের অধিগত এই বিদ্যার পরিচয় দিয়ে এসেছিলেন। (জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) এরপরে বিদ্যাসাগর বিভিন্ন হস্তলিখিত প্রাচীন পুঁথির অতি সতর্ক এবং তুলনামূলক অধ্যয়ন করবার পরে সেগুলিকে সম্পাদিত করে প্রধান প্রধান সংস্কৃত গ্রন্থের নতুন এক-একটি সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন। এগুলির মধ্যে কালিদাস-রচিত গ্রন্থাবলী ছাড়াও বাণের কাদম্বরী ও হর্ষচরিতম, ভবভূতির উত্তররামচরিতম, ভারবির কিরাতাৰ্জুনীয়ম এবং মাঘের শিশুপালবধম—এসব বহুবিখ্যাত গ্রন্থরাজিও ছিল। তবে বাংলাভাষার ব্যাপারে বিদ্যাসাগরকে তখন কার্যতঃ একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হয়েছিল, এবং এবিষয়ে একমাত্র নিজের উপায়-উদ্ভাবনী শক্তির উপরে নির্ভর করেই তাঁকে চলতে হয়েছিল। বস্তুতঃ বাংলাতে তখন বর্ণমালারও কোনো বই ছিল না। কাজেই তাঁকে একেবারে সেখান থেকেই নিজের কাজ আরম্ভ করতে হয়েছিল। খুব সম্ভবতঃ এটাই তাঁর বিধিলিপি ছিল যে, ছোটছোট বাঙালি ছেলেমেয়েদেরকে লিপি-রহস্যের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার জন্য তিনিই বাংলা ভাষার প্রথম বর্ণপরিচয়ের পুস্তক প্রণয়ন করবেন। এরফলস্বরূপ ১৮৫৫ সালে তাঁর রচিত বাংলা প্রথম পাঠ ‘বর্ণপরিচয়’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। এর প্রথমভাগে তখন বর্ণমালা এবং স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের যুক্তরূপ দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয়ভাগে ছিল ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে ব্যঞ্জনবর্ণের মিলনে যেসব যৌগিক বর্ণ তৈরি হয় সেসবের রূপ। দুটি ভাগেই প্রত্যেকটি পাঠের পরে একটি করে অনুশীলনী দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যাসাগরের রচিত এই প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তকগুলি তখন বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, এবং এমনকি পরবর্তীকালের বিভিন্ন রঙিন চিত্রশোভিত চিত্তাকর্ষক বর্ণপরিচয়ের বহু পুস্তকের প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত এই গ্রন্থটি অপরাজিতই থেকে গিয়েছে। আজ অবধি বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় গ্রন্থের যে কতগুলি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে—এর সংখ্যা নির্ণয় করা রীতিমত দুঃসাধ্য। এরপরে তিনি ছাত্রদের সহজপাঠ থেকে ক্রমশঃ কঠিন থেকে কঠিনতর পাঠের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন মানের উপযুক্ত কতগুলি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সেযুগের বাংলা শিক্ষাক্ষেত্রে এই পুস্তক-পরম্পরার প্রথমটির নাম ছিল ‘বোধোদয়’। বর্ণপরিচয় সমাপ্ত হওয়ার পরেই বিজ্ঞান বিষয়ক কিছু কিছু জ্ঞান তরুণ মনগুলিতে সঞ্চারিত করে দেওয়া যায় কিনা—এটির মধ্যে এবিষয়ে একটি দুঃসাহসিক পরীক্ষা করা হয়েছিল। এরপরে তিনি ঈসপের গল্পগুলিকে অনুসরণ করে ‘কথামালা’ এবং তারপরে মহাপুরুষদের জীবনী অবলম্বনে ‘চরিতাবলী’ নামক গ্রন্থ দুটি রচনা করেছিলেন। এই দুটি গ্রন্থই তিনি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে লিখেছিলেন। এগুলির মধ্যে প্রথমটিতে পশুপক্ষীদের বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে ফেলে তাদের নিয়ে গল্প ছিল, যেগুলি তরুণদের মনে বৈষয়িক বুদ্ধির সঞ্চার করবার জন্য লেখা হয়েছিল। আর দ্বিতীয়টিতে তরুণদের অনুকরণের যোগ্য কতগুলি জীবনাদর্শ তুলে ধরা হয়েছিল। এভাবে বাংলা ভাষার উপরে সেযুগের ছাত্রদের চলনসই ধরণের একটা দখল সৃষ্টি করবার পরে শেষধাপের পাঠ্য হিসেবে তিনি আরও দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন; যথা—শকুন্তলা এবং সীতার বনবাস। এগুলি প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ নাটকগুলির মধ্যে পরিগণিত, কালিদাস এবং ভবভূতি বিরচিত দুটি নাটকের কাহিনীর গদ্যরূপ ছিল। এগুলি মূলতঃ ল্যাম্বের ‘টেলস ফ্রম শেক্সপিয়ার’–এর আদর্শে রচিত হলেও, বিদ্যাসাগরের রচিত এই গ্রন্থ দুটিতে মূলগ্রন্থের খুঁটিনাটি অনেক বেশি পরিমাণে রক্ষিত হয়েছিল বলে দেখা যায়। বলা বাহুল্য যে, এই বই দুটি এখন নিজগুণে ঊনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলির মধ্যে পরিগণিত হয়ে থাকে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, তিনভাগে বিভক্ত কর্মসূচী নিয়ে বিদ্যাসাগর তাঁর শিক্ষা সংস্কার সংক্রান্ত পরিকল্পনাটি রচনা করেছিলেন। এতে বাংলাভাষায় ভাবপ্রকাশ করবার ক্ষমতা অর্জনের জন্য সংস্কৃত সাহিত্য আয়ত্ত করবার ব্যবস্থা যেমন ছিল, তেমনি আবার বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার উপায় ছিল, এবং সবশেষে সেযুগের হিন্দু কলেজ ও খৃষ্টান মিশনারিদের কলেজে যে ধরণের ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হত—সেধরণের ইংরেজি শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও ছিল। বৈজ্ঞানিক বিদ্যায় সমৃদ্ধ ছিল বলে তখনকার পাশ্চাত্য শিক্ষাকে বিদ্যাসাগর যে অত্যন্ত সমীহ করতেন, তাঁর নিজের ব্যবহারেই এর ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, তিনি নিজে যখন ছাত্র ছিলেন, তখন সংস্কৃত সাহিত্যের বিভিন্ন পাঠক্রম অধ্যয়ন করবার সাথে তখনকার দিনে যে ইচ্ছানির্ভর ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হত, সেটারও পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি নিজের পরবর্তী জীবনে তিনি যতদিন পর্যন্ত ইংরেজিতে মনোভাব প্রকাশ করবার শক্তি বেশ ভালোরকমভাবে অর্জন করতে পারেননি, ততদিন পর্যন্ত গৃহশিক্ষক রেখে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষালাভ অব্যাহত রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর ইংরেজিতে লেখা চিঠিপত্রগুলি, যেগুলির কোনো কোনো অংশের বঙ্গানুবাদ বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়, সেগুলি থেকে এই ভাষার উপরে তাঁর দখল সম্পর্কে একটা ধারণা করা সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ ঊনিশ শতকের প্রথমদিকে কলকাতার সংস্কৃত কলেজে ইংরেজি শিক্ষার যে সুযোগটি ছাত্রদের দেওয়া হচ্ছিল, সেটি কিছুদিন পরেই প্রত্যাহৃত করে নেওয়া হয়েছিল। যা নিশ্চিতভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে তৎকালীন সরকারের পশ্চাদপসরণের উদাহরণ ছিল। আর একারণেই পরবর্তীসময়ে দেখা গিয়েছিল যে, সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে বিদ্যাসাগর এই ব্যবস্থাটির পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, এরপরে এই নতুন বিভাগটিকে তিনি এমনভাবে পুনর্গঠিত করেছিলেন যে, যাতে এটি ছাত্রদের ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জনের সহায়ক হতে পারে এবং একইসাথে আগেরমত ইংরেজি শিক্ষার বিষয়টিকে ঐচ্ছিক না রেখে তিনি এই ভাষাটিকে প্রত্যেকটি ছাত্রের জন্য অবশ্যপাঠ্য করে দিয়েছিলেন। আর এরকমভাবেই শিক্ষাক্ষেত্র সংস্কার করে তিনি তখন দুটি সংস্কৃতির মিলনের পথও নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।